আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের আগে নভেম্বরের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার দাবিতে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মশাল প্রজ্বলন করে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকায় এই মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচিতে হাজারো মানুষ অংশ নেন। এ ছাড়া রংপুরসহ তিস্তা নদীবেষ্টিত ১০ উপজেলার ৩১টি স্থানে মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উন্মুক্ত মঞ্চ থেকে মশাল প্রজ্বলন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু। তার আহ্বানে নদীর দুই পারে হাজারো মশালে জ্বলে ওঠে আগুন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বহু বছর ধরে তিস্তার ভাঙনে জমি, ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে তারা। এখনই মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না হলে উত্তরবঙ্গের জীবন-জীবিকা চিরস্থায়ী সংকটে পড়বে বলেও জানান তারা।
লালমনিরহাটের খনিয়াগাছ এলাকার কৃষক সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ৩৭ বিঘা জমি ছিল, সবই তিস্তার গর্ভে চলে গেছে।’

একইভাবে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া গ্রামের আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা মহাপরিকল্পনা বুঝি না, বুঝি তিস্তা খনন। যদি নদীটা খোঁড়া হয়, তাহলে আবার ফসল ফলবে, আমরা না খেয়ে মরব না। বউ-ছইল নিয়ে বাঁচতে পারব। সরকার চাইলে আমরা কর দিতে রাজি আছি। জানুয়ারি মাসে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে নভেম্বরে কাজ শুরু করতে হবে।’
তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা মানুষদের দাবির মূল কথা একটাই–নভেম্বরের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে হবে। কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন ‘তিস্তা বন্ড’ চালুর, যেখানে জনগণ নিজেরাই অর্থ দিতে আগ্রহী।
মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অন্তত ২১ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে টাইমস অব বাংলাদেশের কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, খরা ও ভাঙনে তাদের জীবন বিপর্যস্ত, জীবিকা ধ্বংসের মুখে। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ২০ বারেরও বেশি নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তারা।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের এই কর্মসূচিতে সংহতি জানায় ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’সহ নদী-সংরক্ষণে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন। তারা একযোগে আহ্বান জানায়–ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নভেম্বরেই শুরু করতে হবে মহাপরিকল্পনার কাজ।
সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তাই এখনই সরকার নিজস্ব ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে কাজ শুরু করুক। পরে বিদেশি সহায়তা নেওয়া যেতেই পারে। প্রয়োজনে তিস্তা পাড়ের মানুষ তিস্তা বন্ডে অর্থ দেবে।’

আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা আন্দোলন করেছি, কিন্তু প্রতিবারই প্রতিশ্রুতিতে প্রতারিত হয়েছি। আজকে আমরা তিস্তার দুই পাড়ে মশাল প্রজ্বলন করেছি, যাতে সরকার বুঝতে পারে-আমাদের ভেতরের আগুন এখন বাহিরে এসেছে।’
নভেম্বর মাসে কাজ শুরু না হলে এই আগুন দাবানল হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে ফেলে বৈষম্যহীন দেশ গড়া সম্ভব নয়। তফসিল ঘোষণার আগেই কাজ শুরু করতে হবে, নইলে উত্তরবঙ্গকে ভিন্নভাবে অচল করে দেওয়া হবে।’
এই মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা অববাহিকার বারোটি উপজেলায় একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি এলাকায় হাজারো মানুষ অংশ নেন।
এর আগে, একই দাবিতে ৫ অক্টোবর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় বিক্ষোভ করে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ৯ অক্টোবর রংপুর অঞ্চলের সব উপজেলায় বিক্ষোভ করা হয়।


