দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের।
শনিবার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যম ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত ৩৬ জনের মধ্যে ২৮ জনই বিএনপির নেতাকর্মী। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের একজন, জামায়াতের চারজন এবং অন্যান্য দলের তিনজন নিহত হয়েছেন। সহিংসতার ৯৪ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা অন্য দলের সঙ্গে তাদের বিরোধের জেরে।
বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার হার ছিল আশঙ্কাজনক। নির্বাচন কেন্দ্রিক ৩৯৫টি ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ৬০০-এর বেশি।
মব ভায়োলেন্স ও সংখ্যালঘু পরিস্থিতি
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বা মব জাস্টিস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। চুরি, ডাকাতি বা ধর্মীয় অবমাননার মতো অভিযোগে ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলার ঘটনায় মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে, যাতে আহত হয়েছেন ৩১ জন।
নারী ও শিশু নির্যাতন
গত তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে প্রতিবেদনে। এই সময়ে ৬৭০ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪৭ জন ধর্ষণের শিকার হন, যার মধ্যে ৫২ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯ জনকে। এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতার কারণে ১৩৬ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৩৮টি শিশুর।
সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত তিন মাসে ১৮৩ জন সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক নির্যাতনের ৮২টি ঘটনায় ১২২ জন আহত এবং ২০ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর আওতায় ৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ফলে ২০৪ জন আহত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সীমান্ত ও বিচারবহির্ভূত হত্যা
সীমান্তে বিএসএফ-এর হামলায় একজন এবং মিয়ানমার সীমান্তে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। দেশের বিভিন্ন কারাগারে মারা গেছেন ৩৯ জন কয়েদি ও হাজতি।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব জাস্টিস এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তিনি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।


