দেশের তিন বিভাগে ৯০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবে সরকার। এজন্য উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলিত করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হবে। প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
একনেক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি জেলার ৪৭টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলো-ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে বিপদাপন্ন মানুষ এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সুরক্ষা প্রদান; উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করা; প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার পরিবেশের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে জনহিতকর কাজে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি।
প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৯০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং প্রকল্পভুক্ত ২০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য প্রতিটিতে গভীর নলকূপ স্থাপন, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা।
প্রকল্পটি সম্পর্কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের ফলে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং কয়েক বিলিয়ন ডলার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ‘বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন-২০২২’ অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপদাপন্ন ১৯২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম এবং এশিয়া মহাদেশের মধ্যে পঞ্চম।
দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৭টি জেলায় বসবাস করে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসের জন্য স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ৪ হাজার ৬৫৩টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহের মাঝে সরকার কর্তৃক পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী, ঢেউটিন এবং অর্থ সাহায্য প্রদান করা হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা অতিদরিদ্র হওয়ার কারণে পূর্বের অবস্থায় সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসতে পারছেন না। এ অবস্থা হতে উত্তরণের লক্ষ্যে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি গ্রহণের যৌক্তিকতা রয়েছে।
গাজীপুরে নির্মিত হবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) ২৮৫ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘গাজীপুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। ২০২৮ সালের মধ্যে গাজীপুরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করা এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
প্রতিবছর এখান থেকে ১২০ জন ছাত্রছাত্রী বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বের হবেন। প্রকল্পটির উদ্যোগী মন্ত্রণালয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা বস্ত্র অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি সম্পর্কে উদ্যোগী সংস্থা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭ হাজার তৈরি পোশাক কারখানা এবং ২ হাজার ৪০ বস্ত্র শিল্প কারখানা বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল না পাওয়ায় বিদেশ থেকে জনবল নিয়োজিত করতে হচ্ছে। এতে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পর্যায়ের টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করছে।
ডুয়েটের গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন
ঢাকার প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বুধবার একনেকে তোলা হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা গবেষণা সুবিধাদির আধুনিকায়ন পূর্বক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হবে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য গবেষণাগারের আধুনিকায়ন, একাডেমিক ও ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। প্রকল্পটির জন্য ব্যয় প্রাক্কলিত করা হয়েছে ৮৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
জাতীয় আরকাইভস ও গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজেশন
২৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘জাতীয় আরকাইভস ও গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজেশন, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়ন’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়ন করবে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর।
প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি আরকাইভাল ও গ্রন্থাগার সামগ্রী আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় আরকাইভস ও গ্রন্থাগারের ডিজিটাল ডাটার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ; এবং আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রেকর্ড সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলো–দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা উপস্থাপন ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা।


