রাজধানী ঢাকার সিপাহীবাগ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার ওপর দাঁড়ালে কেবল গর্ত আর ধ্বংসস্তূপ চোখে পড়বে না, বরং সেখানে দেখা যাবে মুনাফা অর্জনের এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা। এই ব্যবসার এক ছোট্ট উদাহরণ সিপাহীবাগ ‘লোহার গেট’ সংলগ্ন সড়ক।
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই সড়ক খনন হয়েছে দু’বার। কিছুদিন আগেই একবার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য সড়কটি খননের পর মেরামত করা হয়েছে। তবে জনমনে স্বস্তি ফেরার আগেই সেখানে আবারও ফিরে এসেছে খননকারী যন্ত্র। এবার রাস্তা খননের অজুহাত মাথার ওপরের বিদ্যুৎ সংযোগ মাটির নিচে নিয়ে যাওয়া।
সিপাহীবাগের ভাঙা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. মিলন ধ্বংসের এই চক্র দেখে বলেন, রমজান মাসে রাস্তার মাঝখানে বড় গর্ত করে খনন করেছিল। এখন আবার রাস্তার পাশ দিয়ে অর্ধেক রাস্তা খুঁড়ছে।
একই চিত্র দেখা যায় মোতালেব প্লাজা থেকে কাঁটাবন পর্যন্ত হাতিরপুল এলাকায়। বিটুমিনের পরিবর্তে আরসিসি দিয়ে রাস্তাটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপরই সেখানে আবারও কেবল বসানোর জন্য খনন শুরু হয়।
ঢাকার সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একই রাস্তা বারবার খনন করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও জনগণের দুর্ভোগ এবং অর্থের অপচয় রোধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সরকারি উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বর্তমান আর্থিক সংকটের কারণে যখন অনেক জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প থমকে আছে, তখন এই অপচয় প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, জনগণের এই দুর্দশা তারা বুঝতে পারছেন, কিন্তু তাদের আসলে কিছুই করার নেই।
রাস্তা ভাঙার অন্তরালে ব্যবসা
রাস্তা খননের এই ধুলাবালি আর বিশৃঙ্খলার পেছনে একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা কাজ করে। এখানে জনগণের কষ্ট সরাসরি ব্যক্তিস্বার্থের মুনাফায় রূপান্তরিত হয়। দরপত্র এবং কাজের আদেশ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা জানান, ঠিকাদারদের প্রধান লক্ষ্য থাকে বরাদ্দকৃত বাজেট যেন কোনোভাবেই ফেরত না যায়। তারা জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা না করে ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন।
ঠিকাদারদের কৌশলটি যেমন নিষ্ঠুর তেমনি সহজ। প্রায় সব ঠিকাদার বর্ষাকালে কাজ শুরু করতে চান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্ষাকালে কাজ করলে রাস্তা টেকসই হয় না; খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে পুনরায় মেরামত এবং নতুন দরপত্র আহ্বানের সুযোগ তৈরি হয়। ঠিকাদাররা পুনরায় কাজ পাওয়ার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেন।
বর্ষাকালে রাস্তা খনন নিয়ে সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সময় নিয়ম অমান্য করে অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যেও রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে। কাজের পুরো প্রক্রিয়াটি ইচ্ছা করেই দীর্ঘায়িত করা হয়, যাতে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করা যায়। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বরাদ্দকৃত বাজেট খরচ করা, জনসেবা করা বা টেকসই অবকাঠামো তৈরি করা নয়।
বিল আদায়ের খেলা
কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন মাদরাসা রোডেও একই চক্র চলছে। বিদ্যুৎ লাইনের কাজের পর রাস্তাটি মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ বসানোর জন্য তা কাটা হচ্ছে। এই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার শফিকুর রহমান স্বীকার করেন, এই কাজ শেষ করতে আট মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।
শফিকুর রহমান বলেন, তাদের লক্ষ্য থাকে প্রথম তিন মাসে অন্তত অর্ধেক কাজ শেষ করা। এরপর প্রকৌশলীরা এসে কাজের মান, ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন সমস্যা মূল্যায়ন করেন। সবকিছু সন্তোষজনক হলে বিল অনুমোদন হয়। টাকা পাওয়ার পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। অনেক ক্ষেত্রে পুরো বিল পেতে চারবার পর্যন্ত মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
কাজের বিলম্বের জন্য তিনি চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের হস্তক্ষেপকে দায়ী করেন, যা কাজের সময় এবং ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
হলি ক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী স্বর্ণা রানী পাল প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, গর্তের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় তিনি পড়ে যাওয়ার ভয়ে থাকেন। এ ছাড়া গর্ত থেকে আসা দুর্গন্ধ তার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।
পরিকল্পিত ব্যর্থতার ব্যবস্থা
রামপুরা-খিলগাঁও সড়ক, সেগুনবাগিচার পাইওনিয়ার রোড, কাজীপাড়া মাদ্রাসা রোড এবং পশ্চিম কাজীপাড়া—সবখানেই একই চিত্র দেখা যায়। নতুন মেরামত করা পিচ ঢালা রাস্তা বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বা ড্রেনেজ লাইনের জন্য দ্রুতই আবার খুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের জন্য এই সমন্বয়হীনতার অর্থ হলো মাসের পর মাস কাদা, ধুলোবালি এবং যানজটের মধ্যে কাটানো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও শাসন বিশেষজ্ঞ সাদিক হাসান মনে করেন, এটি কেবল দুর্বল পরিকল্পনা নয় বরং একটি সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক কৌশল। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, মূল লক্ষ্য হলো বরাদ্দকৃত বাজেট যেন কোনোভাবেই ফেরত না যায়। স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধার জন্য জনগণের ভোগান্তিকে উপেক্ষা করা হয়।
সাদিক হাসান আরও জানান, বর্ষাকালে নির্মাণের পেছনে একটি কুটিল উদ্দেশ্য রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে কাজ করলে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যা নতুন দরপত্র ও মেরামতের সুযোগ তৈরি করে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাবে বর্ষাকালে কাজ চলে। অর্থবছরের শেষে বাজেট শেষ করার জন্য নিম্নমানের কাজ করা হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যথাযথ ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার ওপর বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন নির্ভর করে। বাংলাদেশে দূরদর্শিতার অভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি ঘটায় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ায়। বাজেট এবং তহবিল শুরু থেকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করলে বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন হতো না।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনার এই ব্যর্থতা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার, রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট করে। ইফতেখারুজ্জামান যোগ করেন, স্বচ্ছ পরিকল্পনা এবং কঠোর তদারকি থাকলে অপচয় ও জনদুর্ভোগ উভয়ই কমানো সম্ভব হতো।
সমন্বয়ের প্রহসন
ঢাকার সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। সময় এবং সরকারি অর্থের অপচয় হওয়া সত্ত্বেও সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে পারেনি। আর্থিক সংকটের এই সময়ে এই অদক্ষতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, সিটি করপোরেশনের হাত পা বাঁধা। যখন ওয়াসা বা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলো আবেদন করে, তারা অনুমতি দিতে বাধ্য থাকেন।
কেন এই কাজগুলো একসঙ্গে করা হয় না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সংস্থাগুলো তাদের প্রয়োজনে আলাদাভাবে আবেদন করায় সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মেরামত করা অংশগুলো আগের অবস্থায় ফিরে আসে না এবং দ্রুতই তা বিপজ্জনক গর্তে পরিণত হয়।
সমাধানের অভাব
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব এই সড়ক খনন চক্রকে নগর পরিকল্পনার মৌলিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, যদি সব সেবামূলক সংস্থাকে একটি ‘স্মার্ট ইউটিলিটি ডাক্ট’-এর আওতায় আনা যেত, তবে বারবার রাস্তা খননের প্রয়োজন হতো না। তবে এর জন্য একটি কেন্দ্রীয় নগর সরকার প্রয়োজন। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে জনদুর্ভোগ কোনো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
স্মার্ট ইউটিলিটি ডাক্ট হলো রাস্তার নিচে একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, যেখানে বিদ্যুৎ, ফাইবার অপটিক, গ্যাস, পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সুশৃঙ্খলভাবে থাকে। সেন্সরযুক্ত এই ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে রাস্তা না খুঁড়েই মেরামত করা সম্ভব।
ইকবাল হাবিব জানান, ১৯৯৭ সালে নির্মিত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, যার ফলে গত কয়েক দশকে সেখানে রাস্তা না খুঁড়েই লাইনের উন্নয়ন করা হয়েছে।
প্রথমবার সমন্বিত নগর সরকারের দাবি তুলেছিলেন ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। কিন্তু কোনো সরকারই এই দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, স্মার্ট ইউটিলিটি ডাক্ট নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
কাগজে কলমে নিয়ম, বাস্তবে বিশৃঙ্খলা
বিদ্যমান নীতি অনুসরণ করলেও জনদুর্ভোগ অনেকটা কমানো সম্ভব ছিল। ঢাকা শহরের জন্য প্রণীত ‘রাস্তা খনন নীতিমালা ২০১৯’ অনুযায়ী, বড় ধরনের বিঘ্ন এড়াতে ছোট ছোট অংশে খনন কাজ করার কথা। এ ছাড়া খনন কাজ আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে রাতে করতে হবে এবং ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করতে হবে। খননের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব বর্জ্য অপসারণের নিয়মও রয়েছে।
এই নীতিমালায় সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। খনন শুরুর আগে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, সতর্কতামূলক চিহ্ন এবং ব্যারিকেড দেওয়া বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাস্তার পাশে মাটির স্তূপ ও ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকে যা পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যারিকেড বা সতর্ক সংকেত থাকে না, ৩০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমাও মানা হয় না।
ঢাকার রাস্তাগুলো যেন একটি উন্মুক্ত ক্ষত, যা অবহেলার কারণে নয় বরং স্বার্থান্বেষী মহলের মুনাফার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এভাবে রাখা হয়েছে।


