ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কানন নেহার প্রমা ফার্মগেটে প্রাইভেট পড়িয়ে তার হলে ফিরছিলেন। শাহবাগে এলে তিনি নামার জন্য বাসের পেছন দিক থেকে দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরু দরজায় পৌঁছানোর আগেই বাস আবার চলতে শুরু করে। ভিড়ের মধ্যে সিঁড়ি স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে নামতে গিয়ে তিনি হোঁচট খান এবং পায়ে গুরুতর আঘাত পান।
তিনি বলেন, ‘সবসময় ভিড় থাকে, আর হেলপার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। ওই অবস্থায় ওঠানামা করতে হয়, যা খুবই অস্বস্তিকর।’
শহরের অধিকাংশ মিনিবাসে একটি সরু দরজা থাকে—যার প্রস্থ সাধারণত প্রায় ২০ ইঞ্চি। কিছু বাসে দরজাটি সামনের দিকে ইঞ্জিনের পাশে থাকে, যা বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে ওঠানামা আরও কঠিন করে তোলে।
বাসের মেঝে রাস্তা থেকে উঁচু হওয়ায় সমস্যা আরও বাড়ে। কম ভিড় থাকলেও শিশু, বয়স্ক, নারী ও অসুস্থ যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামা করতে অনেক কষ্ট করতে হয়। প্রায়ই বাস থেকে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে, কখনো প্রাণহানিও হয়।
আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, ‘যারা বাসে চলাফেরা করেন না, তারা বুঝতে পারবেন না এটি কতটা কষ্টকর।’
মিনিবাস তুলে দিয়ে বড় বাস চালুর ধারণা ঢাকায় বহুবার উঠেছে, কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি। বড় বাসে সাধারণত দুটি দরজা থাকে, ফলে যাত্রীদের ওঠানামা আরও সহজ হয়। বিশ্বের অনেক শহরে নগর বাসগুলো প্রশস্ত দরজা দিয়ে তৈরি করা হয় যাতে যাত্রীদের দ্রুত চলাচল সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ হাদিউজ্জামান বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য উপযুক্ত নয়।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চলাচল করা এক দরজার বাস দূরপাল্লার জন্য বেশি উপযোগী, শহরের মধ্যে দ্রুত যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে দ্রুত ওঠানামা নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ সড়কের সক্ষমতা সীমিত। দুই দরজার বাস একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।’
বাইরে থেকে অনেক বাসই জরাজীর্ণ মনে হয়। ভেতরের অবস্থা আরও খারাপ—ময়লা ও তেলচিটে সিট, প্রচণ্ড গরমেও নষ্ট ফ্যান, আর যাত্রী তোলার জন্য বারবার থামা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. শামসুল হক এ পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘মিনিবাস তুলে দেওয়া হবে বা সরু দরজা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত বন্ধ করা হবে—এমন প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়।’
‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ একটি ঘুমন্ত প্রতিষ্ঠান। এটিকে জাগাতে হবে—অথবা পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে হবে। এই সংস্থার সংস্কারই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।’
গাবতলী-ডেমরা রুটের বাসচালকের সহকারী মো. শিহাব বলেন, দ্বিতীয় দরজা থাকলে যাত্রী ও কর্মী—উভয়েরই উপকার হবে। তিনি বলেন, ‘ভিড় থাকলে যাত্রীদের ওঠানামা কঠিন হয়ে যায়। দুটি দরজা থাকলে আমাদের জন্যও ভালো হতো।’
তাহলে সেগুলো চালু করা হচ্ছে না কেন? তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এর জন্য বড় বাস দরকার, যা বেশি ব্যয়বহুল। খরচ কমাতে মালিকরা ছোট বাস চালান।’
এমনকি যেসব রুটে বড় বাস চলে, সেখানেও অনেক বাসে একটি মাত্র দরজা থাকে। অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ এড়াতে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দরজাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন পরিচালিত ডাবল ডেকার বাসগুলো ভিন্ন একটি উদাহরণ। এই বাসগুলোতে দুটি দরজা থাকে—সামনেরটি প্রায় ২৪ ইঞ্চি চওড়া এবং পেছনেরটি প্রায় ৪০ ইঞ্চি চওড়া। এতে একসঙ্গে চার থেকে ছয়জন যাত্রী ওঠানামা করতে পারেন।
দুটি ব্যস্ত মোড়ে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুই দরজা থাকলে সাত থেকে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যেই যাত্রী ওঠানামা করতে পারেন। অন্যদিকে ভিড় থাকা মিনিবাসে এ প্রক্রিয়ায় এক থেকে দেড় মিনিট সময় লাগে।
অভ্যন্তরীণ নকশা ত্রুটিপূর্ণ, নেই কোনো নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড
বেশিরভাগ মিনিবাসে দুই সারির সিটের মাঝের পথ প্রায় ১৬ ইঞ্চি—যা দিয়ে কেবল একজন যেতে পারে। কিন্তু অফিস সময়ের ভিড়ে এই জায়গাটিও দাঁড়ানো যাত্রীদের দখলে থাকে, ফলে চলাচল খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বিআরটিসি বাসে এই পথ প্রায় ৩০ ইঞ্চি চওড়া। এতে যাত্রীদের দাঁড়াতে তুলনামূলক কম অসুবিধা হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, ইচ্ছাকৃত নকশাগত পরিবর্তনের কারণে ভিড় আরও বাড়ে। তিনি বলেন, ‘মিনিবাসে ৩১টি সিট থাকার কথা, কিন্তু মালিকরা তা বাড়িয়ে ৪০টি করেন। এ ছাড়া সিটের মধ্যে দূরত্ব ২৬ ইঞ্চি হওয়া উচিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ১৪–১৬ ইঞ্চি করা হয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পষ্ট নীতিমালার অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিয়মে বাস বা মিনিবাসের নকশা, আসনসংখ্যা বা যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
বারবার উদ্যোগ, তবুও পরিবর্তন নেই
গত দুই দশকে যারা সরকারে ছিলেন, তারা ঢাকার গণপরিবহন যাত্রীবান্ধব করতে ও উন্নয়নে নানা প্রকল্প হাতে নেন। তবে বিপুল বিনিয়োগের পরও যাত্রীরা বলছেন, তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রাজধানীর বাসসেবা উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। প্রথম দিকের বড় উদ্যোগ ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালে বাস্তবায়িত হয়, যার ব্যয় ছিল ২৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার—এর মধ্যে ১৭৭ মিলিয়ন ডলার ছিল বিশ্বব্যাংকের ঋণ। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা শক্তিশালী করা।
আরেকটি বড় প্রকল্প ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ২০০৫’ ২০০৪–২০২৪ সময়ের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ছিল। এর লক্ষ্য ছিল যানজট, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ মোকাবিলা করা।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এর সহায়তায় ‘গ্রেটার ঢাকা সাস্টেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ চালু হয়। এর মূল অংশ ছিল গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার বাস র্যাপিড ট্রানজিট করিডর। কিছু অবকাঠামো তৈরি হলেও এখনো এটি চালু হয়নি এবং বাসও কেনা হয়নি।
২০২১ সালে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। প্রথমে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে কাঞ্চপুর রুটে ৫০টি বাস দিয়ে শুরু হয়ে পরে তা প্রায় ১০০ বাসে উন্নীত হয়। এতে একটি কোম্পানি নির্দিষ্ট রুটে বাস চালাবে—এমন ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালুর পরিকল্পনা ছিল।
শুরুতে ইতিবাচক সাড়া পেলেও পরে মালিকদের অনীহা, আর্থিক জটিলতা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে এটি গতি হারায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। বর্তমানে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেছে।
চাহিদা বেশি, বিনিয়োগ কম
প্রতিদিন বিপুল যাত্রী বহন করলেও ঢাকার বাস খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ গণপরিবহন ব্যবহার করেন। এর মধ্যে প্রায় ৬৪% অর্থাৎ ১ কোটি ৩৪ লাখের বেশি মানুষ বাসনির্ভর।
ঢাকায় বর্তমানে ১৫০টির বেশি বাস রুট রয়েছে। তবে বিনিয়োগ সেই হারে বাড়েনি বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যাত্রী বেশি হলেও বিনিয়োগ কম, যার বড় কারণ বাজার কাঠামো।’
তিনি বলেন, ‘পুরনো বাস দিয়েই যদি লাভ করা যায়, তাহলে নতুন বাসে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকে না। ফলে পুরনো ও অনিরাপদ বাসই রাস্তায় আধিপত্য বিস্তার করে।’


