রাজধানী ঢাকায় কর্মজীবী পরিবারগুলোতে শিশুদের ডে কেয়ারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রয়োজনীয় সেন্টারের সংখ্যা একেবারেই কম। ফলে একদিকে যেমন সন্তানদের সুরক্ষা নিয়ে তীব্র দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন মা-বাবা, অন্যদিকে নতুন নতুন কাজের সুযোগ তৈরির একটি বড় সম্ভাবনাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব আর পরিচালনাগত নানামুখী ঝামেলার কারণেই নতুন ডে কেয়ার গড়ে উঠছে না। তাছাড়া ঢাকা শহরে মোট কতগুলো ডে কেয়ার সেন্টার চালু আছে কিংবা সেগুলোতে কতজন শিশু রাখার মতো জায়গা রয়েছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও সরকারের কাছে নেই।
বেসরকারি ডে কেয়ারগুলোর চড়া খরচ সামলাতে না পেরে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে বাসাবাড়ির কাজের লোকের কাছেই সন্তানদের ছেড়ে দিচ্ছেন। কখনো কখনো একলা ঘরেই শিশুদের আটকে রেখে কাজে ছুটতে হচ্ছে মা-বাবাকে। এতে শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার বিষয়টিও চরম ঝুঁকিতে পড়ছে।
ঢাকার বেশিরভাগ নামি বেসরকারি ডে কেয়ারে একেকটি বাচ্চার জন্য মাসে ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। মান ও এলাকাভেদে এই অঙ্ক আরও বাড়ে। বিশেষ করে দু’বছরের ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে খরচ সবচেয়ে বেশি, কারণ তাদের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য আলাদা সেবা দানকারী ব্যক্তির প্রয়োজন হয়।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনায় ডে কেয়ারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে শুধু যে শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় মিলবে তা নয়; বরং নারীদের জন্য আয়া, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ম্যানেজার হিসেবে কাজের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।
রাজধানীতে ডে কেয়ার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে ‘বিসডা ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটির প্রোগ্রাম ডিরেক্টর তানজুম আরা পলি জানান, ডে কেয়ার পরিচালনার জন্য স্পষ্ট কোনো সরকারি অনুমোদন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান স্কুল কিংবা অন্য কোনো সংস্থার লাইসেন্স সংগ্রহ করে কোনোমতে কাজ চালাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বেসরকারি ডে কেয়ারগুলো সরকারের কাছ থেকে বলতে গেলে কোনো সহায়তাই পায় না। তাছাড়া নীতিমালায় ‘প্রতি তিন শিশুর জন্য একজন কেয়ারগিভার’ রাখার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অতিরিক্ত খরচের কারণে বাস্তবে তা মেনে চলা অত্যন্ত দুরূহ।
‘কেয়ারিং হ্যান্ডস ডে কেয়ার’-এর অপারেশনাল ডিরেক্টর পারভীন আক্তার জানান, ডে কেয়ার চালানোর জন্য উপযুক্ত বাসা বা ভবন ভাড়া পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বাধা।
তিনি বলেন, “শিশুদের কান্নাকাটি, হইচই, মানুষের ঘনঘন যাতায়াত কিংবা রান্নাবান্নার ঝামেলার কথা ভেবে বাড়ির মালিকরা ডে কেয়ারের জন্য ভবন ভাড়া দিতেই চান না। আবার কোথাও উপযুক্ত জায়গা মিললেও তার ভাড়া হাঁকা হয় আকাশচুম্বী।”
পারভীন আক্তার জানান, ডে কেয়ার পরিচালনার জন্য কোনো সুস্পষ্ট সরকারি গাইডলাইন নেই। আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলোকে সুনির্দিষ্ট লাইসেন্সও দেওয়া হয় না। প্রাপ্ত আয়তনের ওপর ভিত্তি করে একটি সেন্টারে সর্বোচ্চ কতজন শিশু রাখা যাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়মমালা জারির দাবি জানান তিনি।
উদ্যোক্তারা এই খাতে প্রশিক্ষণের অভাবকেও দায়ী করছেন। পারভীন বলেন, ‘শিশুদের সঙ্গে কিভাবে মেশা উচিত এবং কিভাবে তাদের আচরণ গড়ে তোলা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সরকারি উদ্যোগেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। বেসরকারি কোর্সগুলোর ফি এত বেশি যে, অধিকাংশ উদ্যোক্তা বা কর্মীর পক্ষেই তা বহন করা সম্ভব হয় না।’
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালায় প্রতি তিন মাস পর পর কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তদারকির দেখা মেলে না। ফলে মানহীন ডে কেয়ারগুলো বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, আর ভালো মানের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মিরপুরের ‘কেয়ার চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর প্রতিনিধি তিতলী বলেন, নীতিমালার কিছু শর্ত ছোট উদ্যোক্তাদের একেবারে কোণঠাসা করে ফেলে। যেমন, ১০ লাখ টাকার জামানত রাখা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তিনি জানান, একটি কেন্দ্র গড়ে তুলতে ঘর সাজানো, দক্ষ কর্মী, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগের দরকার হলেও ব্যাংকগুলো এই খাতে কোনো ঋণ দেয় না।
‘এটি মোটেও লাভজনক কোনো ব্যবসা নয়, অথচ দায়িত্ব বিশাল। ভালো বেতন দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে মাস্টার্স পাস করা কোনো শিক্ষক কেন এই পেশায় আসতে চাইবেন?’—প্রশ্ন তোলেন তিতলী।
তিনি জানান, তার সেন্টারে বর্তমানে ১৫-১৬ জন শিশু এবং ১৫ জন কর্মী রয়েছে। এখানে স্কুলের পাশাপাশি ডে কেয়ার সার্ভিসও পরিচালনা করা হয়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পরিচালিত এই সেন্টারে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা পাঠ্যক্রম ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
ডে কেয়ার সেন্টার পরিচালনাকারীদের মতে, অভিভাবকদের আস্থার ঘাটতিও আরেকটি বড় সমস্যা। তানজুম আরা পলি জানান, একের থেকে অন্যের শরীরে রোগবালাই ছড়ানোর ভয়, আনা-নেওয়ার ভোগান্তি ও নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করে সামর্থ্যবান পরিবারগুলো ডে কেয়ারের চেয়ে বাসায় কাজের লোক রাখাকেই বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক মনে করে।
তবে সরকারি ডে কেয়ার সেন্টারগুলোর চিত্র কিছুটা আলাদা; এখানে খরচ বেশ কম। লালমাটিয়া সরকারি ডে কেয়ার সেন্টারের এক প্রতিনিধি জানান, তাদের এখানে বর্তমানে ৫৮ জন শিশু রয়েছে। দৈনিক তিন বেলার খাবারসহ তিন বছর বয়সী একটি শিশুর জন্য মাসে খরচ পড়ে মাত্র ১,২০০ টাকা। এটি পরিচালনায় রয়েছেন চারজন কেয়ারগিভার, দুজন গার্ড, একজন শিক্ষক, একজন স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন ডে কেয়ার অফিসার।
সচিবালয় ডে কেয়ার সেন্টারের সেবা নেওয়া রীপা নামের এক মা জানান, সন্তানের বয়স এক বছর হওয়া থেকে তিনি সেখানেই তাকে রাখছেন। সন্তানকে নিরাপদ পরিবেশে রেখে তিনি নিশ্চিন্তে নিজের চাকরি করতে পারছেন। তবে মগবাজারের এজিবি ডে কেয়ারে তার আগের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না; সেখানকার কর্মীরা দেরিতে আসায় প্রায়ই তার অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যেত।
অন্য এক অভিভাবক তুলে ধরেন সময়ের জটিলতা। তিনি জানান, সরকারি ডে কেয়ারগুলোর বেঁধে দেওয়া সময়সূচির কারণে চাকরিজীবীদের বেশ বিপাকে পড়তে হয়। কারণ অফিস ছুটির সময় আর ডে কেয়ার বন্ধের সময় একই। ফলে কর্মজীবী মা-বাবারা ঠিক সময়ে কিভাবে সন্তানকে সেখান থেকে নিতে আসবেন—সেই দুশ্চিন্তা থেকেই যায়।


