ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের মন জয়ে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ এমন সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেগুলোর বাস্তবায়নে আসলে তাদের কোনো ক্ষমতাই নেই।
নির্বাচনের আট মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর এমন অনেক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি যখন নেই, তখন ডাকসুর নেতারা বলছেন, এগুলো প্রশাসনিক উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়।
এমন এক প্রতিশ্রুতি ছিল প্রথম বর্ষ থেকে সব শিক্ষার্থীর হলে আসন নিশ্চিত করা। অস্থায়ী সমাধান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে অস্থায়ী হোস্টেল বা মাসিক আবাসন ভাতা আর স্থায়ী সমাধান হিসেবে হল নির্মাণের কথাও বলা হয়।
কিন্তু হল প্রাধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, আসন সংকটের কারণে সবাইকে আবাসন সুবিধা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিউদ্দিন খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এগুলো শুধু ডাকসুর একক এখতিয়ারের বিষয় নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পরই সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’
নতুন হল নির্মাণ বা আসনসংখ্যা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এমন কথাও বলেন তিনি।
যেসব প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব নয়, সেগুলো কেন ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছিল, তার কোনো ব্যাখ্যা অবশ্য শিবির নেতার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। হল নির্মাণ হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী হোস্টেল বা মাসিক আবাসন ভাতার ব্যবস্থা করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সে বিষয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাত জাহান ইমু টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ডাকসু ব্যর্থ হলেও শিবিরের মঞ্চ হিসেবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে তারা সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করেছে।’
‘নির্বাচনের আগে হলে ঠান্ডা পানির মেশিন, নারীদের প্যাড ডিস্পেন্সারি মেশিন স্থাপন করলেও ডাকসু গঠনের পর আর সেগুলার রক্ষণাবেক্ষণ না করায় কিছুদিন পর থেকেই অকেজো হয়ে আছে। ডাকসুর নেতাদেরও একই অবস্থা,’ বলেন তিনি।
‘শিক্ষার্থীদের মূলা দেখানো হয়েছিল’
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ভোটের ৮ দিন আগে ১ সেপ্টেম্বর শিবির সমর্থিত প্যানেল ঘোষণা করে ৩৬ অঙ্গীকারের ইশতেহার। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর প্রধান অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিস বিভাগের শিক্ষার্থী মুব্বাসীর মাহমুদ নিবিড় টাইমসকে বলেন, ‘আমি এগুলোকে শিক্ষার্থীদের সামনে মূলা ঝুলানোই বলব। তাদের উচিত ছিল বাস্তবে যেসব পরিবর্তন আনা সত্যিই সম্ভব, সেগুলোই ইশতেহারে রাখা।’
কিছু প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে ডাসকুর চেষ্টা বোঝাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গিয়ে দাবি পেশ, বা জমায়েতের ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোতেই এখন শিবির নেতারা তাদের চেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন।
গত ২০ এপ্রিলের রেজিস্ট্রার ভবন ঘেরাও কর্মসূচির কথাই তোলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি যেখানে বলছেন, এক বছরে হল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, সেখানে তারা সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের হলে আবাসন সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়ে রেজিস্ট্রার ভবন ঘেরাও করেন।
যেগুলো করা ‘সম্ভব ছিল’
বেশ কিছু অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল বলে মনে করেন শিক্ষার্থী মুব্বাসীর। উদাহরণ হিসেবে তিনি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হল ও অন্যান্য ক্যান্টিন-ক্যাফেটেরিয়ায় পুষ্টিবিদের তত্ত্বাবধানে স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর খাবারের মেন্যু প্রণয়ন এবং প্রতি তিন মাস অন্তর খাবারের মান পরীক্ষা করার অঙ্গীকারের কথা বলেছেন।
প্রতিটি অনুষদে মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া স্থাপন এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ‘মিল ভাউচার’ চালু করাও সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘খাবারের গুণগত মান, স্বাস্থসম্মত ক্যান্টিনসহ নানা কথা বলা ছিল যেগুলোর আদতে কোনো বাস্তবায়ন নেই।’
ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পরে কয়েকটি হলে শিবির নেতারা ক্যান্টিন মালিকদের শাসিয়েছেন। তাদের সেসব ভিডিও ভাইরাল হলে সমালোচনার মুখে পরে তা বন্ধ হয়েছে।
রেজিস্ট্রার বিল্ডিংকে পেপারলেস করা, বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর যে কথা বলা হয়েছিল, তারও বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করে মুব্বাসীর বলেন, ‘কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি রেজিস্টার ভবনের গাফিলতির কারণে আমাদের দুইজন শিক্ষার্থীর বিদেশ গমন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।’
শিবিরের প্যানেল জয়ী হতে পারলে রেজিস্ট্রার ভবনে সেবা গ্রহণ করতে গেলে ‘লাঞ্চের পরে আসেন’ বলে বক্তব্য বলা হয়, তার অবসানের কথাও বলেছিল।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হাসিবুল আলম তাহীন টাইমসকে বলেন, ‘এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
ইশতেহারে ছাত্রী হলে প্রবেশে নারী শিক্ষার্থীদের বিধি-নিষেধ শিথিল করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র প্রদর্শন-সাপেক্ষে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। ছাত্রী হলে অভিভাবকদের জন্য ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’ স্থাপন করার অঙ্গীকারও ছিল।
রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী মনিষা চাকমা বলেন, ‘এক হলের মেয়ে অন্য হলে তার বান্ধবীর কাছে যেতে পারে না। গেস্টরুম পর্যন্ত যাওয়া যায়, যতটুকু ছেলেরাও যেতে পারে। আর গার্ডিয়ান লাউঞ্জের নামটাই এখনো শুনিনি।’
সব কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগ, মা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং রুম’ এবং ‘চাইল্ড কেয়ার কর্নার’ স্থাপন তহবিল সংকটের কারণে করা যায়নি, বলছেন ডাকসুর কমনরুম, রিডিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা।
তিনি বলেন, ‘বাজেট নিয়ে সমস্যা, তাই আমরা আপাতত কয়েকটি জায়গায় এটা করেছি। কলা ভবনের নিচতলার কমনরুমে এটা যোগ করেছি, চতুর্থ তালার কমনরুম ও টিএসসিতেও কাজ চলমান।’
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা, ছাত্রী হলগুলোতে পুরুষ কর্মচারীর সংখ্যা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা এবং প্রক্টরিয়াল টিমে প্রয়োজনীয়সংখ্যক নারী সদস্য নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। নারীদের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার বিষয়ে আলাদা কোনো উদ্যোগও নেই।
পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষ্ঠু ট্র্যাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ গড়ার পাশাপাশি প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে পরিচ্ছন্নতা অভিযানও আর চলে না।
ক্যাম্পাসে বহিরাগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ভাসমান হকার ও ভবঘুরেদের উচ্ছেদের যে অঙ্গীকার করার পর ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অভিযানের ঘটনা ঘটেছে। সেসব অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডাকসু নেতারা মানুষকে পিটিয়েছেন। এ নিয়ে সমালোচনা হতে থাকলে ডাকসু নেতারা পিছিয়ে আসেন।
নিবন্ধিত রিকশা চালু এবং ভাড়া তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারও বাস্তবায়ন নেই।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভিযোগ সেল শক্তিশালী করা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো অনেকটাই অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।
শিবির নেতা কী বলছেন
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে এই ফারাকের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান টাইমসকে বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৩-১৪টি প্রতিশ্রুতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। কিছু বিষয় নীতিগত হওয়ায় সেগুলোর প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এগুলোর দৃশ্যমান ফল পেতে কিছুটা সময় লাগছে, তবে সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। শেষ পর্যন্ত এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারব বলে আমরা আশা রাখি।’
আরও সাত-আটটি অঙ্গীকার নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া ও সময়স্বল্পতার কারণে আটকে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসে গত ২৬ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী কাজ করেছেন তা তুল ধরতে গিয়ে বেশ কজন বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকের কথা তুলে ধরেন।
সূর্যসেন হলের ছাত্রদল নেতা আবিদুর রহমান মিশু টাইমসকে বলেন, ‘এসব বৈঠকে শিক্ষার্থীদের কোনো লাভ হয়েছে?’
ছাত্র মৈত্রীর নেত্রী ইমু বলেন, ‘তারা এখন সফলতা পরিমাপ করে কয়টা কবর জিয়ারত করেছেন, কয়টা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, কাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, কতবার বিবৃতি দিয়েছেন, কয়টা কুইজ, সেমিনার ও সুন্দর হাতের লেখা আহ্বান করা হয়েছে তা দিয়ে।’


