টাইমস ক্লাসিক: নারী অধিকারের গল্প ‘মোল্লাবাড়ির বউ’

টাইমস ক্লাসিক: নারী অধিকারের গল্প ‘মোল্লাবাড়ির বউ’
'মোল্লাবাড়ির বউ' ছবির পোস্টার
Advertisement
Advertisement

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে তখন ছিলো ‘অশ্লীলতা’ নামক কালো মেঘের ছায়া। সে সময়ে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এসেছিলো ‘মোল্লাবাড়ির বউ’। না, ছবিটি কালো মেঘের ছায়া পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি। কিন্তু সালাউদ্দিন লাভলুর ছবিটি ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ, যেখানে তিনি কথা বলেছেন—গ্রামীণ মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, নারীদের অধিকারের। ২০০৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়া ছবিটি সম্প্রতি তার মুক্তির ২০ বছর পূর্ণ করলো। এ ছবিটি দিয়ে যাত্রা শুরু করলো ‘টাইমস ক্লাসিক’।

লাভলু তখন টুকটাক নাটক নির্মাণ করেন এবং জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। সে সূত্রে প্রয়াত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে তার পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। ১৪ বছর টানা দুজন একসঙ্গে বিভিন্ন নাটকে লেখক-অভিনেতা-নির্মাতা হিসেবে ছিলেন।

একদিন শামসুজ্জামান তাকে বলেন, “লাভলু’ তুমি যেরকম নাটক করো, তাতে কিন্তু সিনেমা বানানো উচিত।” উত্তরে লাভলু তাকে ‘প্রযোজনা কে করবে’, তাছাড়া সিনেমা বানানোর জন্য যে প্রস্তুতির দরকার তা তার নেই বলে জানান। চলচ্চিত্রের আরেক বিখ্যাত প্রযোজক মতিউর রহমান পানু লাভলুর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘রঙের মানুষ’-কে সিনেমায় রূপ দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তা সম্ভব নয় জানিয়ে লাভলু বলেন, ‘এটা তো সম্ভব না, তার চেয়ে এটিএম ভাইয়ের কাছে একটা গল্প আছে, চলেন, ওইটা করি।’ উনি বললেন, ‘তাই নাকি? এটিএম ভাই তো আমাদের নিজের মানুষ। চলো শুরু করি।’ পানুর সঙ্গে আলাপের সূত্রে ছবিটি প্রযোজনা করেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র প্রযোজক আব্বাস উল্লাহ শিকদার।

একদম মাটির কাছ থেকে তুলে আনা গল্পের ছবি ‘মোল্লাবাড়ির বউ’। গ্রামবাংলার মোল্লাবাড়ি, যেখানে ধর্মীয় আবরণে স্বামী ও পরিবারের পুরুষেরা নারীর উপর চালায় ক্ষমতার দাপট। সংসার জীবনের নানান সম্পর্কের ভেতর জমাট বাঁধা দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে পর্দায়।

এতে ছবিতে শাবনূর, মৌসুমীর মত তারকা সমান্তরাল চরিত্রে অভিনয় করেন। ওই সময়ে যা ছিল অকল্পনীয়। তবে তারা দুজন ছাড়া ছবিতে আরও দুটি মূল চরিত্রে ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান ও রিয়াজ।

আরও পড়ুন

শাবনূর ‘পারুল’, মৌসুমী ‘বকুল’ চরিত্রে। দুজনই নারীজীবনের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—কেউ আপোষহীন প্রতিবাদে, কেউ ধীরে ধীরে জেগে ওঠা বোধে। দর্শক দেখেছে, এক বাড়ির ভেতরেই কীভাবে কুসংস্কার, তাবিজ-কবচ, জ্বীনের ভয় নারীর জীবনে শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়ায়।

আবার অন্যদিকে এটিএমের করা ‘গাজী এবাদত মোল্লা’ চরিত্রটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে ধর্মীয় মুখোশ ব্যবহার করে পরিবার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটিই ছবির মূল বক্তব্য—একজন মানুষের হাতে অন্ধ আনুগত্য কেমন ভয়াবহ হতে পারে।

ছবিটির নির্মাণে ছিল লাভলুর টেলিভিশন নির্মাণশৈলীর পরিষ্কার প্রভাব। সংলাপ ছিল সহজ, কিন্তু আঘাত করত সোজা মনে।

কাহিনি, সংলাপ ও অনবদ্য অভিনয়ের পাশাপাশি ছবিটির শক্তি ছিল গান। ‘বনের কোকিল’, ‘খড় কুটার এক বাসা বাঁধলাম’, ‘অন্তর দিলাম বিছাইয়া’—এসব গান শুধু দর্শক টানেনি, চরিত্রের আবেগও গভীর করেছে।

ছবিটি মুক্তির পর রীতিমত আলোড়ন তৈরি হয়। তখনকার পত্র-পত্রিকাগুলো লিখেছিল, ‘এমন ছবি দীর্ঘদিন পর এসেছে, যেখানে গান-সংলাপ-চরিত্র সব একসঙ্গে কাজ করছে।’ গ্রাম কিংবা শহরের সিনেমা হল সবখানে গেলে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ফলাফল দেশের অন্যতম ‘ব্লকবাস্টার’।

ছবির গল্পে যেমনটা দেখানো হয়েছে, আমাদের সামাজে নারীরা আজও কুসংস্কার, পরিবার ও সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দাপটে ভোগে। এ ছবির চরিত্র, গান, সংলাপ আর সামাজিক বাস্তবতা— যা আজও প্রাসঙ্গিক। দারুণ জনপ্রিয় ও আলোচিত এ ছবিটি ২০১৯ এ বঙ্গবিডি রিমেকের ঘোষণা দিলেও তার আর হয়নি। সালাউদ্দিন লাভলু ছবিটির পর ‘ওয়ারিশ’-এর ঘোষণা দিলেও আর কোনো ছবি নির্মাণ করেননি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর