সারা দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেল ও অকটেনের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন গাড়ির চালকরা। অনেক স্থানে ফিলিং স্টেশনে সৃষ্টি হচ্ছে চরম উত্তেজনা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রামে রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় ইসলাম ব্রাদার্স ফিলিং স্টেশনের চিত্রটি বর্তমান সংকটের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। এই স্টেশনে সপ্তাহে ২৭ হাজার লিটার ডিজেল ও নয় হাজার লিটার অকটেনের চাহিদা থাকলেও যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ। গত সপ্তাহে তারা মাত্র নয় হাজার লিটার ডিজেল ও তিন হাজার লিটার অকটেন পেয়েছে।
স্টেশনের মালিক সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, যমুনা অয়েল কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছে না। নয় হাজার লিটারের ট্যাঙ্কারে মাত্র তিন হাজার লিটার সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ সাধারণ গ্রাহকরা তেল মজুতের অভিযোগ তুলে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হচ্ছে। উত্তেজিত গ্রাহকদের হামলার ভয়ে কর্মীরা একাধিকবার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এই একই চিত্র এখন সারা দেশে। চট্টগ্রাম বিভাগের পেট্রোল পাম্প মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, অনেক এলাকায় ডিজেল ও অকটেনের সরবরাহ ৩০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। সেখানে দৈনিক ১২ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র চার লাখ লিটার। অধিকাংশ স্টেশনে পেট্রোল নেই, ডিজেল ও অকটেনের মজুতও তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে সাগরে মাছ ধরার ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, হোটেলের জেনারেটরও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে পর্যটন ও মৎস্য খাতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উত্তরের জেলা নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাটে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন এখন তেলশূন্য। স্থানীয় বাসিন্দারা ১০০ থেকে ২০০ টাকার তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সংকটের সুযোগ নিয়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে তেল বিক্রি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগে দৈনিক ৪০ লাখ লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ১০ লাখ লিটার। যশোর ও বাগেরহাটের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। সিলেট ও বরিশালে সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা সচল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
রাজধানী ঢাকাতেও মঙ্গলবার সকাল থেকে ফিলিং স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এক স্টেশনে তেল না পেয়ে চালকরা অন্য স্টেশনে ছুটছেন। তেলের সংকট আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কেনার চেষ্টা করছেন, যা ভিড়কে আরও দীর্ঘ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমান সংঘাত বিশ্বকে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট বা ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নীতিনির্ধারকরা এখনো এই সংকটের গভীরতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন না বলে তিনি সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর বা চীন থেকে এলেও অপরিশোধিত তেলের জাহাজীকরণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘নরডিক পোলক’ নামের একটি জাহাজ এক লাখ টন তেল নিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুয়ায় আটকা পড়ে আছে।
‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের আরেকটি জাহাজের ৩১ মার্চ আমিরাত থেকে তেল নিয়ে আসার কথা থাকলেও যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তায় জাহাজ মালিকরা চলাচলে দ্বিধাগ্রস্ত বলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।
বিপিসির ২৩ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে যা ১৪ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অকটেনের মজুত আছে ১১ হাজার টন, যা দিয়ে চলবে নয়দিন এবং পেট্রোলের মজুত ১৬ হাজার ৬০৫ টন যা দিয়ে ১১ দিন চলবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে থাকা ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল দিয়ে আরও ১৭-১৮ দিন কাজ চালানো সম্ভব। নতুন চালান সময়মতো না পৌঁছালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত ১৮ লাখ টন ডিজেল কেনার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।
এ নিয়ে কথা বলতে বিপিসি’র চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন বলেন, সরবরাহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। ‘আমরা সরকারের কাছে শুধু নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানাই।’
সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হক যোগ করেন, সরকারি আশ্বাসের সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
তবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ঈদ পরবর্তী সময়ে ডিপো বন্ধ থাকা এবং হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ এম তামিম ভিন্ন বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মজুত করা জ্বালানি দিয়ে বেশিদিন চলার জন্য সরকার হয়তো বর্তমানে অল্প পরিমাণে তেল বাজারে ছাড়ছে, যা একটি কৌশল হতে পারে।
তিনি সিঙ্গাপুর, জাপান ও চীনের মতো দেশগুলোতেও সরবরাহ সংকটের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়া বা নাইজেরিয়া থেকে চড়া মূল্যে হলেও তেল আমদানির পথ খোঁজার পরামর্শ দেন।
[এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সিলেট ও বরিশাল প্রতিনিধি।]


