সবুজ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রশ্নে ভোটারদের প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং পরিবেশগত শাসনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি চোখে পড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মানুষ পরিবেশভিত্তিক সবুজ সমাজ চায়, তবে একই সঙ্গে ভালো সড়ক, সেতু ও দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকেও সরে আসতে চায় না।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সামাজিক সফট ডেভেলপমেন্টে কিছুটা গুরুত্ব দিলেও সবুজ অর্থনীতি গঠনের জন্য এখনো সুস্পষ্ট রূপরেখা অনুপস্থিত।
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। ফলে উন্নয়ন সম্পর্কে তাদের ধারণা এখনো অবকাঠামোকেন্দ্রিক, যা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে।
শহরাঞ্চলের প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটার উন্নয়নকে সরাসরি সড়ক ও সেতু নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
ভোটারদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও উন্নয়ন বিষয়ে প্রায় একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ভাবনা তুলনামূলক বিস্তৃত হলেও ভোটারদের দৃষ্টি এখনো মূলত দৃশ্যমান প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত জানান, ৯৫ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে উন্নয়ন ভাবনার একমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নকে আড়ালে ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তার মতে, উন্নয়ন আলোচনায় অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জীবনমানের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
জরিপে পরিবেশ সুরক্ষার উপায় হিসেবে ৬১ শতাংশ ভোটার গাছ লাগানো ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রার্থীরাও প্রায় একই ধরনের সমাধানের কথা বলেছেন।
গবেষকদের মতে, সহজে করা যায়-এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগকেই অনেকেই মূল সমাধান হিসেবে দেখছেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন–এমন ভোটারের হার ৪৭ শতাংশ এবং প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ। তবে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে দেখার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরিবেশ ও অর্থনীতির তুলনায় সামাজিক উন্নয়নকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটার ও প্রার্থীরা। দারিদ্র্য, আয় ও কর্মসংস্থানের চাপ এতটাই প্রবল যে সামাজিক বিষয়গুলো গৌণ হয়ে পড়ছে।
সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভোটারদের অগ্রাধিকার মূলত দুটি খাতে সীমাবদ্ধ-স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। সিপিডির মতে, এটি প্রমাণ করে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াইয়ে ব্যস্ত।
এই জরিপে ১৫০টি নির্বাচনী এলাকার ৪৫০ জন প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধির পাশাপাশি ১ হাজার ২০০ জন ভোটারের মতামত নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি এবং সামাজিক উন্নয়ন–এই তিন স্তম্ভে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যাশা ও পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।


