নানা নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত লাভ-ক্ষতির হিসেবে জামায়াত সমমনাদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় থাকতে চায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একটি অংশ। তারা প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও দলের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
যদিও দলটির নেতারা বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করে বলছেন, ইসলামী দলের ভোট ‘একবাক্সে’ পাঠানোর নীতিতে তারা অটল রয়েছেন। সমঝোতা থেকে বের হয়ে আসেনি এখনো ইসলামী আন্দোলন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত আসন বন্টনের কথা জানাতে ১১ দলের পক্ষে বুধবার সংবাদ সম্মেলন ডাকেন জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। বিকাল সাড়ে চারটায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে দিনভর নানা ঘটনার পর দুপুরে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়।
একজন জামায়াত নেতা টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেছেন, শেষ মুহুর্তে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে সংবাদ সস্মেলনের পেছানোর জন্যে অনুরোধ করা হলে জোট নেতারা তাতে সাড়া দেন।
তবে, সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার কোন অনুরোধ করা হয়নি বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
বুধবার তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিভেদের বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। আসন সমঝোতা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
ইসলামী আন্দোলনের একাধিক সূত্র বলছে, মঙ্গলবার রাতে আসন সমঝোতার বিষয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি জেলা শাখার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পুরানা পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দলটির কয়েকজন নেতা এবং প্রার্থী মতামত দেন, জোট থেকে বের হয়ে একক নির্বাচন করলে তারা একটি আসনও জিততে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই জোট থেকে ভোট করলে তাদের অনেকেই ভালো করবেন।
বুধবার দুপুরেও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আসন সমঝোতার চেয়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদেরকে ‘পাত্তা’ না দেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
বৈঠক থেকে দলটির জ্যেষ্ঠ এক নেতা জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতাকে ফোন দিয়ে আরো ভালোভাবে বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার আহ্বান জানান। তখন সমঝোতায় তিনি আরো একটু সময় নিতে চাইলে সংবাদ সস্মেলন স্থগিত করা হয়।
জামায়াত ইসলামীর সহকারী জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস’কে বলেন, আসন নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় বুধবারের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। সমঝোতা চূড়ান্ত হলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন থেকে ঘোষণা আসবে।
টানাপোড়েনের সৃষ্টি যেভাবে
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আসন সমঝোতায় চেষ্টা করে আসছিল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য ছয়টি দল। যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। পরে যুক্ত হয় আরও তিনটি দল কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শেষ মুহুর্তে এসে এই তিনটি দল, বিশেষ করে এনসিপি যুক্ত হওয়ায় নিজেদের কাঙ্খিত আসন না পাওয়া নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে ইসলামী আন্দোলন।
গেল কিছুদিন দফায় দফায় বৈঠকের পর ইসলামী আন্দোলন ও মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ছাড়া বাকি নয়টি মধ্যে আসন সমঝোতা হয়।
অবশ্য কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও শেষ পর্যন্ত নমনীয় হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে কোনোভাবেই আপোষ রফা করা যায়নি। জামায়াত ৪৫টি আসন দিতে চাইলেও ইসলামী আন্দোলন চাইছে ৬০টি আসন।
এনিয়ে জোটের সঙ্গী জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান টাইম’কে বলেন, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের মধ্যে আসন নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান হয়ে যেতে পারে। জোটের শীর্ষ একজন নেতা বলছেন, ইসলামী আন্দোলন জোটে না থাকলেও বৃহস্পতিবারের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চাইছে জামায়াত ইসলামীর হাইকমাণ্ড।
কে কতটি আসন পেতে পারে
দলগুলোর একাধিক সূত্র বলছে, ১১ দলের মধ্যে জামায়াত ১৯০টি, ইসলামী আন্দোলন ৪৫টি, এনসিপি ২৯টি, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৪টি, আহমদ আব্দুল কাদেরের খেলাফত মজলিস পাঁচটি, এলডিপি পাঁচটি, এবি পার্টি তিনটি এবং জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টিকে একটি করে আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রে দু’একটি আসন বোড়তে বা কমতে পারে।
এই হিসাবে দলগুলো ২৯৫ আসনে সমঝোতা করেছে। অবশিষ্ট পাঁচটি আসনের মধ্যে অমুসলিম, বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রার্থী এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তযোদ্ধাদের জন্যে রাখা হয়েছে। তারা বিশেষ কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে বিবেচিত হবেন না।


