চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগরে র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রায় দুই থেকে তিন শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব-৭। হামলার পর এলাকায় যৌথ বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালিয়ে ২০ থেকে ২৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বর্তমানে এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে র্যাব ও যৌথ বাহিনীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে রাস্তার অন্তত চারটি স্থানে বড় গর্ত তৈরি করে রাখে। যা ছিল দুটি ক্যাম্পের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই তারা এই কাজটি করেছে। এতে যানবাহন নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। পরে সদস্যরা হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সেই সুযোগে মূল সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
র্যাব অধিনায়ক জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাব, জেলা পুলিশ, রেঞ্জ রিজার্ভ পুলিশ (আরআরএফ) ও এপিবিএনের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় ১৫০ জন সদস্য অবস্থান করছেন এবং পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানের সময় সন্দেহভাজন হিসেবে ২০ থেকে ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরপরাধদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ব্রিফিংয়ে র্যাব জানায়, হামলার সময় সন্ত্রাসীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে র্যাবের কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য জিম্মি বা নিখোঁজ হওয়ার খবর সত্য নয় বলে স্পষ্ট করেন অধিনায়ক।তিনি বলেন, এটি গুজব ও ভুল বোঝাবুঝি থেকে ছড়িয়েছে।
হাফিজুর রহমান জানান, হামলায় অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি একে-৪৭, রাইফেলের মতো ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যাম্পের সামনে সন্ত্রাসীরা একটা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর বিশেষ করে আলিনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রধান সড়ক থেকে ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে আলিনগরে পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যেই সন্ত্রাসীরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
র্যাব অধিনায়ক আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের নিজস্ব সোর্স থাকায় তারা আগেভাগেই প্রশাসনের অভিযানের খবর পেয়ে যায়। বিশেষ করে ইয়াসিন গ্রুপ-এর সদস্যরা আলিনগরের পেছনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নেয় বলে জানান তিনি।
ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করতে না পারার বিষয়ে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে ভৌগোলিক সমস্যা বেশি। গত ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে সে জঙ্গল সলিমপুর থেকেই বের হয়নি। আমরা বিভিন্ন দিকে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছি। সেই তথ্য আমরা নিচ্ছি। আমরা বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছি কিন্তু সে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে আমরা যদি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতে পারি তাহলে সে ধরা পড়বে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসার আগে সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে যায়, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই পুরো এলাকায় এই এলাকারই লোকজন। আমরা মেইন রাস্তা দিয়ে যখন জঙ্গল সলিমপুরে ঢুকি তখন দেখা যায় এই গ্রুপেই দুইটা লোক ছিন্নমূলের বাইরে বসে থাকে, এটা অস্বাভাবিক নয়। তাদের কাজ হল শুধু ফোন করে তথ্যটি জানিয়ে দেওয়া। এটার জন্য আমার প্রশাসনের লোক দরকার নেই। এভাবেই তারা তথ্য আগে থেকে পেয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সন্ত্রাসীরা অন্যায়ভাবে একটা বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করেছে। এটা গুরুতর অন্যায়। এই ঘটনায় মামলা হবে।’
সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘গত ১৫ মাসে র্যাব বিভিন্ন হত্যা মামলার ৩৬৬ জন আসামিসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে অনেক আসামি দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত বিচার কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।


