চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে রুক্ষ কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে ওঠা কয়েক দশকের পুরনো এক ‘বিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্য’ অবশেষে আইনের শাসনের অধীনে এসেছে। তবে জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে যৌথ অভিযান সফল হলেও সরকার এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর সেটি হলো কোনো ধরনের মানবিক সংকট তৈরি না করে সরকারি ভূমি পুনরুদ্ধার করা।
ছায়া শাসনের দুর্গ ও বর্তমান পরিস্থিতি
দীর্ঘ বছর ধরে জঙ্গল সলিমপুর কেবল একটি জনবসতিই ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের ভেতর অন্য এক রাষ্ট্র। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ এই অঞ্চলের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানান, অপরাধী চক্রগুলো কেবল এই ভূমি দখলই করেনি, এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি পরতও নিয়ন্ত্রণ করত। স্কুল, বাজার থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দির পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো অবৈধ ‘গডফাদারদের’ ইশারায়।
যদিও যৌথ বাহিনীর অভিযানে এসব অপরাধী বর্তমানে আত্মগোপনে চলে গেছে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া শূন্যতা এখন সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। প্রশাসন এখন এমন এক জনগোষ্ঠীর মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কেবল অন্ধকার জগতের নিয়ম দেখে বড় হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের এই দুর্গম এলাকায় পরিচালিত নিরাপত্তা অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ জানান, এই অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় পিস্তল এবং একটি এলজি শটগানসহ তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে ২৭টি পাইপগান, ৩০টি পিস্তল ম্যাগাজিন, অস্ত্র তৈরির ৫৭টি পাইপ, ৬১টি কার্তুজ এবং ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলি। একই সাথে ১১টি ককটেল এবং অবৈধ অস্ত্র তৈরির একটি লেদ মেশিনও জব্দ করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই এলাকাটি অপরাধীদের অবৈধ অস্ত্র তৈরি ও মজুত করার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
অভিযান-পরবর্তী পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে স্থানীয় দুটি স্কুলে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন ও ৩৬০ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অভিযানটি এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যার লক্ষ্য এলাকায় পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও অবশিষ্ট অপরাধী নেটওয়ার্ক নির্মূল করা।
উন্নয়ন পরিকল্পনা: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিন জানান, সরকার এই এলাকার উন্নয়নের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জিয়া উদ্দিন জানান, সরকারের পরিকল্পনায় ১১টি বড় প্রকল্প রয়েছে যা এই রুক্ষ পাহাড়কে একটি জাতীয় হাবে রূপান্তর করবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি আইকনিক মসজিদ, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক পর্যটনকে চাঙ্গা করতে একটি নাইট সাফারি পার্ক নির্মাণ।
তবে এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘মানবিক দিকটি’ এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার পরিবার, যাদের অনেকেই ভূমিদস্যুদের দ্বারা শোষিত হয়েছে, তারা এই পাহাড়কেই নিজেদের ঠিকানা মনে করে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, মানবিক কারণে হাজার হাজার মানুষকে হঠাৎ করে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। ফলে প্রশাসন এখন বেশ সতর্কভাবে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।
জিয়া উদ্দিন বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের কল্যাণ ও তাদের সঠিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন প্রশাসনের অগ্রাধিকার। তাদের লক্ষ্য হলো একদিকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যদিকে প্রকৃত ভূমিহীনদের চিহ্নিত করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
ভবিষ্যতের সীমানা নির্ধারণ
সামাজিক সমস্যার মতোই এই এলাকার কারিগরি জটিলতাও বেশ প্রকট। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত জানান, কর্মকর্তারা এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সরকারি জমির সীমানা আলাদা করছেন। পাহাড় কাটা সিন্ডিকেটের জাল ছিন্ন করার এটিই প্রথম ধাপ। একই সাথে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে যেন দরিদ্র মানুষগুলো, যাদের ভূমিদস্যুরা অনেক সময় ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে, তারা যেন নিঃস্ব হয়ে না পড়ে।
এখনো উদ্বেগ-আতঙ্ক:
মঙ্গলবার র্যাব ও পুলিশের কড়া পাহারায় এলাকাটি শান্ত মনে হলেও স্থানীয়দের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল। অনেক পরিবারকে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর দীর্ঘকাল ধরে দরিদ্র এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হলেও এটি অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে। বর্তমানে এই বিশাল পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক লাখ মানুষ বসবাস করে, যা একটি ছোটখাটো শহরের সমান।
জামাল উদ্দিন নামের ৬৫ বছর বয়সী এক পল্লী চিকিৎসক বলেন, এখানকার বেশিরভাগ মানুষই নিম্নআয়ের শ্রমজীবী। তারা মাথার ওপর একটু ছাদ পেতে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় এখানে বিনিয়োগ করেছেন। অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
জামাল উদ্দিনের আশা, সরকার তাদের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক দিকটি বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে ৫৫ বছর বয়সী ফেরদৌস বেগম এই নতুন ‘শান্তি’ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। ঘরবাড়ি গুছিয়ে সাময়িকভাবে এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখানে মাঝেমধ্যেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, কিন্তু কয়েক দিন পর সব আবার আগের মতোই হয়ে যায়।
আগামীর পথ
জঙ্গল সলিমপুর এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি কি আধুনিক উন্নয়ন এবং পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের প্রতীক হবে, নাকি বিপুল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জটিলতায় সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থমকে যাবে? আপাতত প্রশাসন জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্তগুলোকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষের বার্তা স্পষ্ট: জমি রাষ্ট্রেরই থাকবে, তবে মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে তার সমাধান হতে হবে।


