চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচলাবস্থার মুখে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) থেকে রপ্তানি কনটেইনারগুলো এখনও বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। এতে চারটি জাহাজ রপ্তানি পণ্য ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর উদ্দেশ্যে বন্দর ছেড়ে গেছে।
রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে নেমেছেন পরিবহন শ্রমিক ও সিএন্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্টরা। বন্দর কর্তৃপক্ষের আরোপিত নতুন শুল্ক (ট্যারিফ) ও যানবাহন প্রবেশ ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি জাহাজে ৪০০ থেকে ৫০০ টিইইউ (টোয়ান্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) রপ্তানি কনটেইনার পণ্য দিয়ে বোঝাই হওয়ার কথা ছিল। তবে ওই চার জাহাজে ঠিক কতগুলো কনটেইনার খালি থেকে গেছে তা তাৎক্ষনিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ২০০ টিইইউ রপ্তানি কনটেইনার বেসরকারি ডিপো থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। শনিবার ভোর থেকে পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় এরইমধ্যে দুই হাজারেরও বেশি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে আটকে গেছে। বহু রপ্তানি চালানের সময়সূচিতেও ধস নেমেছে।
বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘পরিবহন বন্ধ থাকায় শত শত কনটেইনার ডিপোতে আটকে আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠাতে না পারার শঙ্কায় রয়েছেন রপ্তানিকারকরা।’
বাসরকারি রপ্তানিকারক ভার্টেক্স অফ-ডকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ধর্মঘটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টিইইউ রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে খালাস না হয়ে জমে থাকছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাইম মুভাররা (মূল পরিবহনকারী) পুরোদমে কাজ না করায় ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে বেশ দেরি হতে পারে। এতে রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।’
এদিকে চলমান সংকট নিরসনে রোববার দুপুরে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন বন্দর চেয়ারম্যান।
বর্ধিত ফি নিয়ে অসন্তোষ
গত ১৫ অক্টোবর থেকে নতুন শুল্ক (ট্যারিফ) কার্যকর হওয়ায় বন্দরের সেবার দাম (সার্ভিস ফি) গড়ে ৪১ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর অংশ হিসেবে বন্দরে যানবাহন প্রবেশের ফিও ৫৭ দশমিক ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি টিপে ২৩০ টাকা করা হয়েছে।
প্রাইম মুভার (মূল পরিবহনকারী) মালিকরা এই ফি বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা কে বহন করবে? আমদানিকারক, রপ্তানিকারক না ডিপো অপারেটর? যে পর্যন্ত তা স্পষ্ট করা না হবে, আমরা পণ্য পরিবহন বন্ধ রাখব।’
চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হোসেন বলেন, ‘পরিষ্কার নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কাজ শুরু করতে পারছি না। প্রতিদিন প্রায় আট হাজার যানবাহন- প্রাইম মুভার, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান বন্দরে চলাচল করে। এখন অধিকাংশই অচল হয়ে আছে।’
সিএন্ডএফ এজেন্টদের কর্মবিরতি
বন্দরে নতুন শুল্ক আরোপের পর কর্মী অসন্তোষের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে সিএন্ডএফ এজেন্টদের চার ঘণ্টার কর্মবিরতি। রোববার সকাল ৯টা থেকে এ কর্মবিরতি শুরু হয়। এতে আমদানি ও রপ্তানির কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, পরিবহন শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেই তারা এই কর্মবিরতিতে গেছেন।
ফলে আমদানি পণ্য ছাড় করানো যাচ্ছে না আবার রপ্তানি কনটেইনারও জাহাজে ওঠানো যাচ্ছে না।
সরবরাহ চেইনের ওপর প্রভাব
বন্দরের এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, ‘আমদানি পণ্য বন্দরে আটকে আছে, আর রপ্তানিও থেমে গেছে। আমদানিকারকরা বাড়তি স্টোরেজ ও ডেমারেজ খরচের মুখে পড়বেন, যার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, আংশিকভাবে পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটলেও বন্দরের ‘কার্গো হ্যান্ডলিং’ কার্যক্রম ঠিকঠাক চলছে। তিনি বলেন, ‘কিছু পয়েন্টে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও অনেক যানবাহনই বন্দরে প্রবেশ করছে।’


