নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গণপরিবহন নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম নগরে চালু হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ ‘মহিলা বাস’ সার্ভিস। প্রাথমিকভাবে দুটি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এ সেবায় চালক ও সহকারী–দুই দায়িত্বেই থাকবেন নারীরা। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকা থেকে নগরের ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করবে বাস দুটি। পথে নির্ধারিত ১২টি পয়েন্টে নারী যাত্রীরা ওঠানামার সুযোগ পাবেন।
মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকায় বেলুন উড়িয়ে এ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়।একই দিনে রাজধানী ঢাকা ও বগুড়া জেলার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও বিশেষায়িত এই পরিবহনসেবা চালু করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। তিনি বলেন, এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা আশা করব, সরকার যে উদ্দেশ্যে এ কর্মসূচি শুরু করেছে, নারীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদভাবে চলাচল করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। সরকারের অঙ্গীকার সরকার বাস্তবায়ন করছে।’
১২ পয়েন্টে ওঠানামা
নতুন এ সেবার দুটি বাস কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকা থেকে ছেড়ে নগরের ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করবে। রুটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নির্ধারিত ১২টি স্টপেজ রাখা হয়েছে। ফলে কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত যাতায়াতকারী নারী যাত্রীরা নির্দিষ্ট পয়েন্টে বাসে উঠতে ও নামতে পারবেন।
বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, রুটটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ থেকে ২৫ কিলোমিটার। যাত্রাপথের দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৮ টাকা। কালুরঘাট থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। আর কালুরঘাট বা কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত পুরো পথে সর্বোচ্চ ভাড়া ৬৮ টাকা।

চালক-সহকারীও নারী
এই বাস সার্ভিসের বিশেষত্ব হলো, বাস পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চালক ও সহকারীরাও নারী। ফলে যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও নারীদের অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাসের এক নারী চালক বলেন, নারী চালক, নারী সহকারী ও নারী যাত্রী- সব মিলিয়ে এ সেবায় কাজ করতে পেরে তিনি গর্বিত। সবাইকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বাসের দায়িত্বে থাকা নারী সহকারীরাও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যাত্রীদের সেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি এ উদ্যোগ পরিবহন খাতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে।
নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তি
চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক নারী গণপরিবহন ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রচলিত বাসে অতিরিক্ত ভিড়, আসনসংকট এবং নানা ধরনের হয়রানির কারণে তাদের অনেক সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ইভটিজিং, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
নতুন সার্ভিসের উদ্বোধনের দিন নারী যাত্রীদের মধ্যে তাই ছিল স্বস্তির অনুভূতি। বাসে থাকা এক নারী যাত্রী বলেন, সাধারণ বাসে যাতায়াতের সময় মেয়েদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এখন চালক, সহকারী ও সহযাত্রী সবাই নারী হওয়ায় নিরাপত্তার অনুভূতি অনেক বেশি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন ছিল। এখন সেই সুযোগ তৈরি হওয়ায় যাতায়াত আরও স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা করছেন তারা।

পরিধি বাড়ানোর আশা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম, বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলমসহ বিআরটিসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রাথমিকভাবে দুটি বাস দিয়ে সেবাটি শুরু হলেও এর কার্যক্রম ও যাত্রীচাহিদা পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন ও সাড়া বিবেচনায় ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা এবং সেবার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তাদের আশা, পৃথক এই পরিবহনব্যবস্থা চালুর ফলে চট্টগ্রাম নগরে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। পাশাপাশি নারী চালক ও সহকারী নিয়োগের মাধ্যমে পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণও আরও দৃশ্যমান হবে।


