২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘জনবান্ধব নয়’ এবং ‘চট্টগ্রামবান্ধবও নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
শুক্রবার বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এ বাজেট সাধারণ জনগণকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একইসঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ন্যায্য গুরুত্বও এতে প্রতিফলিত হয়নি।
নজরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস ও কর রাজস্বের মাধ্যমে দেশের সর্বাধিক অবদান রাখলেও সেই অনুপাতে উন্নয়ন বরাদ্দ ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা বাজেটে স্থান পায়নি। বে-টার্মিনাল প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেলপথ, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট সমস্যা সমাধান, নগরীর সড়ক উন্নয়ন এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে অতীতে সংঘটিত কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও অপচয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে নতুন বরাদ্দ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। কালুরঘাট রেল-কাম-সড়ক সেতুর দ্রুত বাস্তবায়ন, চায়না ইপিজেড অনুমোদন এবং কর্ণফুলী টানেলকে লাভজনক করতে কার্যকর অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়েও বাজেটে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে ‘পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা’ রুখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত স্বচালিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে (এনসিটি) উপেক্ষা করে লালদিয়ারচর বা অন্য কোনো খোলা স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
তবে কয়েকটি খাতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নগর জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ৬০টি প্রধান ভোগ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, আমদানিকৃত হার্টের স্টেন্ট, চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স, কিডনি রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার, দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য, পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব ইতিবাচক উদ্যোগ।
তবে দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের কারণে এসব সুবিধার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। নজরুল ইসলাম বলেন, বাজার, রাস্তা, ঘাট, নালা-নর্দমা, এমনকি রোগী ও লাশ পর্যন্ত দলীয় সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত নয়। ফলে বাজেটের ইতিবাচক নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ নাগরিকের ব্যাংক হিসাব খুলতেও টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার বিধান জনগণের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আগাম কর, কাস্টমস ডিউটি এবং বিভিন্ন পরোক্ষ কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
তার অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের ফলে দলীয় কর্মীদের লুটপাট, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আরও বাড়বে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষকে বহুমাত্রিক ভোগান্তির শিকার হতে হবে। পরোক্ষ করের বোঝা শেষ পর্যন্ত গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতকে লুটেরা ও অর্থপাচারকারীদের প্রভাবমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার যদি অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এ বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক ও তরুণ গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা, চাকরিচ্যুত তরুণদের পুনর্বাসন এবং বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর কর্মসূচির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও বরাদ্দ রাখা হয়নি।
বিবৃতির শেষে মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের ঘোষিত প্রথম বাজেট দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পথকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করবে। সামগ্রিকভাবে এ বাজেট ধনীদের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।


