খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচয়ে ধর্মীয় উৎসব বড়দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির একটি গির্জায় গিয়ে প্রার্থনায় অংশ নেন। অথচ একই সময়ে তার দল ও সরকারের মদদপুষ্ট কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা চালায় এবং ধর্মীয় আচার পালনে বাধা দেয়।
বেশিরভাগ হামলার ঘটনা ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে, যেমন মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, আসাম ও হরিয়ানা।
আসামের নলবাড়ি জেলায় বজরং দল একটি খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে ভাঙচুর চালায়। এই সংগঠনটি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) সঙ্গে মিলে, বিভিন্ন রাজ্যে বড়দিন উদযাপনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়।
গত ২৪ ডিসেম্বরও একই ধরনের ঘটনা ঘটে একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে। জয়পুর, বিদিশা, ভোপাল, গুয়াহাটি, বেরেলি ও ইন্দোরসহ বিভিন্ন শহরে ভিএইচপি ও বজরং দলের সদস্যরা শপিং মল, স্কুল, দোকান ও বড়দিন উদযাপনকারী সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়।
এদিকে, কেরালার পালাক্কাড জেলার পুদুসসেরি গ্রামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দিনের ক্যারল গান বন্ধ করে দেন।
আরএসএস একটি চরম ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন, যার সদস্য নরেন্দ্র মোদিও। একই সময়ে বিজেপি-শাসিত উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে গঙ্গার তীরে রাজ্য পর্যটন বিভাগের পরিচালিত একটি হোটেলে আয়োজিত বড়দিনের অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব হামলার বিরুদ্ধে বিজেপির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকেও কোনো নিন্দা বা বিবৃতি আসেনি। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রশ্নে মোদি সরকারের অবস্থান ‘গভীর দ্বিচারিতা’ প্রকাশ করে। দেশের ভেতরে খ্রিষ্টান ও মুসলমানরা হামলার শিকার হলে দিল্লি নীরব থাকে, অথচ প্রতিবেশী দেশে হিন্দুদের সঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটলে সরকার অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ হয়। এই বাছাই করা ক্ষোভ রাজনৈতিক ভণ্ডামিকেই সামনে আনে।
এ যেন ‘ঘরে বিড়াল, বাইরে বাঘ’।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উৎসব, প্রার্থনা সভা ও দৈনন্দিন ধর্মীয় কার্যক্রমের সময়। বড়দিনে উদযাপন বাধাগ্রস্ত হওয়া, গির্জা ভাঙচুর, ক্যারল গায়কদের থামিয়ে দেওয়া ও উপাসকদের ওপর হামলা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বারবার ঘটছে।
এই ঘটনাগুলো মূলত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেই বেশি দেখা যায় এবং প্রায়ই এমন সংগঠনগুলো এতে জড়িত থাকে, যেগুলো আদর্শিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। তবু সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে এসব হামলার নিন্দা খুব কমই শোনা যায়। প্রধানমন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কিংবা দলের নেতৃত্ব সাধারণত এসব ঘটনার কথা স্বীকারই করেন না, দায় নেওয়া তো দূরের কথা।
দেশি ও আন্তর্জাতিক বহু গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও মোদি সরকার একই অবস্থান ধরে রেখেছে।
সম্প্রতি ভারতের ক্যাথলিক বিশপস সম্মেলন দেশজুড়ে খ্রিষ্টানদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ‘উদ্বেগজনক’ বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও অভিযোগ করেছে, হিন্দু উগ্রবাদী দলগুলো বিভিন্ন জায়গায় গির্জা ভাঙচুর, বড়দিনের সাজসজ্জা তছনছ এবং উৎসব উদযাপনকারীদের হুমকি দিয়েছে।
খ্রিষ্টানদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওপেন ডোরস জানিয়েছে, বড়দিনের সময় ভারতে খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে অন্তত ৬০টির বেশি হামলার ঘটনা রেবর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যেই, বড়দিনের পরদিন শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিং আয়োজন করে। সেখানে মুখপাত্র রণধীর জয়সাল সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিলেও, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশের মিশনের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রতিবাদ কিংবা বড়দিনে খ্রিষ্টানদের ওপর ধারাবাহিক হামলা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এই নীরবতা কাকতালীয় নয়। এটি একটি রাজনৈতিক হিসাবের প্রতিফলন, যেখানে সংখ্যালঘু নিপীড়নের কথা স্বীকার করা মানে শাসক প্রতিষ্ঠানের যত্নে লালিত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার আদর্শিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
এই সহিংসতা উপেক্ষা বা খাটো করে দেখানোর মাধ্যমে সরকার কার্যত একে স্বাভাবিক করে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে বাছাই করা, যেখানে ভুক্তভোগীদেরই কখনো কখনো জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, আর হামলাকারীরা মুক্তই থেকে যায় বা সামান্য শাস্তি পায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যেন গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, প্রতিবেশী দেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার খবর এলেই বিজেপি সরকার দ্রুত বিবৃতি দেয়, কূটনীতিক তলব করে কিংবা আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তোলে। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকেও পদ্ধতিগত নিপীড়ন হিসেবে তুলে ধরে সরকারি ব্রিফিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচার এবং অনুগত গণমাধ্যমে জোরালোভাবে প্রচার করা হয়।
এই বৈষম্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। ধর্মীয় সহিংসতা যদি নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়, তবে সেই নীতি কেন বেছে বেছে প্রয়োগ করা হবে? অন্য দেশের কাছে জবাবদিহি দাবি করে ভারত নিজ দেশে কেন তা এড়িয়ে যায়?
এই দ্বিচারিতার পরিণতি গুরুতর। এটি ধর্মনিরপেক্ষতার অঙ্গীকার করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাইরে সংখ্যালঘু অধিকারের কথা জোরে বলা আর ঘরে নীরব থাকা কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং ভণ্ডামির অভিযোগকে জোরালো করে। আরও বিপজ্জনক হলো, এতে দেশের ভেতরের চরমপন্থী শক্তিগুলো বার্তা পায় যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের আড়াল করবে, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে এবং সামাজিক সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলে।
মোদি সরকার যতদিন না দেশের ভেতরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মোকাবিলায় একই মাত্রার জরুরি পদক্ষেপ নেয়, যতটা সে বাইরে দেখায়, ততদিন তার নৈতিক কর্তৃত্বের দাবি দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফাঁপা শোনাবে।


