প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে ইরান। এরইমধ্যে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনা হয়েছে তার কফিন। শুক্রবার সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা খামেনির কফিনটি কাঁধে নিয়ে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চে রাখেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ধর্মীয় নেতারা এ সময় কফিনের সামনে দিয়ে অতিক্রম করেন।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, খামেনির মরদেহ একটি কফিনে মঞ্চের ওপর রাখা, আর তার সামনে লাল টিউলিপ ফুল সাজানো রয়েছে। সিলিং থেকে ঝুলছে কাগজের প্রজাপতির মতো সাজসজ্জা।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির কফিনের পাশে আছে তার ১৪ বছর বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়েজানি, মেয়ে বোশরা খামেনি, জামাতা মেসবাহ বাঘেরি কানির মরদেহ। নাতনি জাহরার কফিনের সামনে রাখা আছে তার শিশু বয়সের ফুটফুটে ছবি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে খামেনির বাসভবন ও কার্যালয় লক্ষ্য করে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অতর্কিত ওই বিমান হামলায় পরিবারের সদস্য ও কাছের বেশ কয়কজন সঙ্গীর পাশাপাশি নিহত হন আয়াতুল্লাহ খামেনি।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওর বরাতে বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার তেহরানে খামেনির বাসভবনের কমপাউন্ডে অবস্থিত হুসেনিয়াহর কাছে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ কম্পাউন্ডেই তিনি নিহত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইআরএনএ-এর খবরে বলা হয়, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা স্বজন ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরিহিত ছিলেন। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার কফিন স্পর্শ করার জন্য তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে নিজেদের পরনের স্কার্ফ ও অন্য জিনিস কফিনে ছুড়ে দেন-যা ইরানের প্রচলিত শোকরীতির অংশ।
প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, খামেনির কফিনটি লাল পতাকায় আবৃত, যার ওপর সাদা আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ‘ইয়া হুসাইন’। এটি শিয়া মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শোকপ্রকাশের প্রতীক। সপ্তম শতকে মুসলমানদের শেষ নবী মুহাম্মদ (সা:) এর নাতি হুসাইন (আ:) এর শহীদ হওয়ার স্মৃতিকে ধারণ করে এই ক্যালিগ্রাফি আঁকা হয়।
এই পতাকা ইরাকের কারবালায় ইমাম হুসাইনের স্বর্ণগম্বুজ বিশিষ্ট মাজারেও উত্তোলিত থাকে। এটি একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির রক্তপাতের প্রতীক এবং প্রতিশোধের আহ্বান হিসেবেও বিবেচিত।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার (৪জুলাই) থেকে খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা শুরু হবে। তার মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকেও নিয়ে যাওয়া হবে। প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী রাজধানী তেহরানে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ৭ জুলাই ইরাকের ধর্মীয় নগরী কোমে বিশেষ শোক অনুষ্ঠান করা হবে।
তেহরান, কোম, ইরাক ও মাশহাদে পাঁচদিনব্যাপী খামেনির জানাজা এবং দাফন-সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯ জুলাই তার জন্মশহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সময় তেহরানে সড়ক বন্ধের পাশাপাশি আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম সীমিত রাখা হবে, যাতে শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।
এদিকে আয়াতুল্লাহ খামেনির আনুষ্ঠানিক জানাজা ঘিরে প্রকাশ্যে এসেছেন ইরানের আধাসামরিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসের এক প্রভাবশালী জেনারেল আহমাদ ভাহিদি।
অনলাইনে প্রকাশিত ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ছবিতে দেখা যায়, জেনারেল ভাহিদি খামেনির জানাজা সংক্রান্ত একটি বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। পরে তাকে তেহরানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনের কাছে বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত একটি ছোট শোকসভায় তার কফিনের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাহিদি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইরানের কঠোর অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাকে এমন একটি ছোট গোষ্ঠীর অংশ বলে মনে করা হয়, যারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন।
মোজতবা খামেনি এখনও আত্মগোপনে আছেন এবং ধারণা করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারির ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর থেকেই তিনি আড়ালে রয়েছেন। ভাহিদিকে সবশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজায় তিনি প্রকাশ্যে অংশ নেবেন কিনা তা এখনো নিশ্চিত করেনি ইরানি কর্তৃপক্ষ।


