গাজায় যুদ্ধের অবসান এবং পুরোপুরি ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চায় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস। ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার নিয়ে আলোচনায় তারা স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েল গাজায় হামলা বন্ধ না করলে এবং স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি না করলে তারা জিম্মি মুক্তির দিকে এগোতে পারছে না।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, মিশরের শারম আল-শেখে ইসরায়েল-হামাস প্রতিনিধিদের সঙ্গে মঙ্গলবার মধ্যস্থতাকারীদের দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে এসব শর্ত দেয় সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
মঙ্গলবার বৈঠক শেষে হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি জোট যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘সবধরনের প্রতিরোধ’ বজায় রাখবে। ট্রাম্পের শর্ত অনুযায়ী, হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে তারা হুঁশিয়ার করেন, কেউই ফিলিস্তিনি জনগণের অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটি বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনি জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম।
হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা ফাওজি বারহুম বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ শেষ এবং “দখলদার সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার” চাই। কিন্তু গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। বরং তারা বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী দিয়ে গাজা শাসন করতে চাইছে। এমনকি বন্দি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও হামাসকে প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে জিম্মি মুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এসব অনিশ্চয়তা আমরা মেনে নিতে পারি না।’

এক হামাস কর্মকর্তা জানান, তারা ধাপে ধাপে বন্দিমুক্ত করতে চান। প্রতিটি ধাপেই ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। মঙ্গলবারের আলোচনায় মূলত বন্দিমুক্তির সময়সূচি এবং কোন কোন এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার হবে তা নিয়ে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হামাসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়, হামাসের হাতে ‘সবশেষ বন্দির’ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে গাজা থেকে ‘সবশেষ ইসরায়েলি সেনাকেও’ প্রস্থান করতে হবে।
ইসরায়েল এর আগেও দুইটি যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে অভিযোগ করে হামাসের আরেক শীর্ষ নেতা খালিল আল-হাইয়া মিশরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল কাহেরা নিউজকে বলেন, ‘আমরা দখলদার ইসরায়েলকে এক সেকেন্ডের জন্যও বিশ্বাস করি না। হামাস “নিশ্চয়তা” চায় যেন সত্যিই যুদ্ধ শেষ হয় এবং গাজাবাসীর ওপর আবার কোনো আক্রমণ না হয়।’
এর আগে, গাজা যুদ্ধের দ্বিতীয় বছর পূর্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘গাজা চুক্তির একটি “বাস্তব সম্ভাবনা” রয়েছে। আমরা কিছু শর্তে কোনো ছাড় দিব না।’
হামাসের সঙ্গে আলোচনা আরও এগিয়ে নিতে বুধবার কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মিশরে যাচ্ছেন বলেও নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউজ।
আল জাজিরা জানিয়েছে, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিনআবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানি বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেবেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘গত দুই বছরের যুদ্ধ ছিল “আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ও ভবিষ্যতের” জন্য যুদ্ধ। আমরা গত দুই বছরে নিজেদের এমন স্থানে নিয়ে গিয়েছি যেখানে ইসরায়েলই “নির্ধারক”। আমরাই সিদ্ধান্ত নেব।’
হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনার বিষয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করলেও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইসরায়েল যুদ্ধের সব উদ্দেশ্য পূরণে কাজ চালিয়ে যাবে। সব বন্দির মুক্তি, হামাস শাসনের অবসান এবং গাজাকে ইসরায়েলের জন্য আর কোনো হুমকি হিসেবে রাখা হবে না।’
এদিকে ইসরায়েল-হামাস শান্তি চুক্তির আলোচনায় স্পষ্ট মতভেদ সত্ত্বেও হামাসের ইতিবাচক মনোভাবকে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি বাস্তবায়নে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন মধ্যস্থতাকারীরা। ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বেশিরভাগ শর্তকে স্বাগত জানিয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী দেশ- কাতার, মিশর ও তুরস্ক নমনীয় অবস্থানে থেকে শান্তি নিশ্চিতের নানা বিকল্প ধারণা তুলে ধরছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো পূর্বনির্ধারিত ধারণা নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। আলোচনার সময়ই আমরা বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করছি, যাতে সব পক্ষের কাছে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পথ থাকে।’


