বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকাণ্ডে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থায় চিড় ধরেছে ও সরকারের মতিগতি বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতে এই সরকার কীভাবে দেশ চালাতে চায়, সেটি এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে আকস্মিক বিদায় করে ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে সোয়েটার কারখানার মালিক মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। এর মাত্র দুই মাস আগেই নীতি সহায়তার আওতায় নিজের প্রতিষ্ঠান হিরা সোয়েটার্স লিমিটেডের খেলাপি ঋণ নিয়িমিত করিয়ে নিয়েছিলেন একাউন্টিং ও কস্ট ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রিধারী এই ব্যবসায়ী।
দেশের অর্থনীতি ঘুড়ে দাঁড়ানোর জন্য যখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন, তখন সরকারের ‘অগোছালো কার্যক্রম’ সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
পাশাপাশি তাড়াহুড়ো করে নতুন গভর্নর নিয়োগের পেছনে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর পূর্বের মালিকপক্ষের যোগসাজোস থাকতে পারে বলেও সন্দেহ বিশ্লেষকদের। পূর্বে এই ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। মজুমদার বর্তমানে কারাগারে থাকলেও সাইফুল আলম মাসুদ (এস আলম) তার সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন।
পূর্বে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আসম গ্রুপের হাতে। আর এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। ২০২৪ এর জুলাই অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ব্যাংকগুলো একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গভর্নর পদের নিয়োগটাই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদে হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সামনে সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তা সরকারের শুরুর দিকের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে। গভর্নর নিয়োগের মাধ্যমে সিগন্যালটা ইতিবাচ হলো না। এই সরকারের সঙ্গে কাজের পরিবেশের নিশ্চয়তা, এন্ট্রি-এক্সিটের নিশ্চয়তা ধ্বংস করে দিয়েছে এই একটা সিদ্ধান্ত।’
‘গভর্নর অপসারণের প্রক্রিয়ার সিগনালটাই সবচেয়ে নেতিবাচক। কারো কাজ নিয়ে আপত্তি থাকলেও তাকে পদ থেকে সরানোর একটি প্রক্রিয়া থাকে। ন্যূনতম সৌজন্যতা দেখানো হলো না। এমন না যে সুযোগ ছিল না। কারণ আগের দিনও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক হলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে’ বলেন এই অর্থনীতিবিদ।
ব্যবসায়ী মহল থেকে গভর্নর নিয়োগ হলেও বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন না বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘গভর্নর পদে যেভাবে বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন হলো, এটি একটি বিশৃঙ্খলার বার্তা দিয়েছে। এই সরকার সম্পর্কে প্রেডিক্টিবিলিটি নষ্ট হয়ে গেছে, যা ব্যবসার জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।’
এভাবে ‘গভর্নর পদে পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংক মার্জারের ইস্যু জড়িত থাকতে পারে’ বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন গভর্নরের একাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের কথা বাদই দিলাম – তার নিয়োগে স্বার্থের দ্বন্দ্ব হবে কি না এই প্রশ্ন যৌক্তিকভাবেই উঠবে। নতুন গভর্নর তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ব্যবসায়িক সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন এর দালিলিক প্রমাণ থাকা দরকার।’
এদিকে নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে আরও চমকপ্রদ তথ্য এসেছে টাইমসের হাতে। সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগ আছে এবং বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ঘনিষ্ট এমন একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বধীন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের তিন দিনের মধ্যেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে মোস্তাকুর রহমানের। সেখানে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন মোস্তাকুর।
ওই বৈঠকের পরেই ফেব্রুয়ারির ২০ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত হয় মোস্তাকুরকে গভর্নর নিয়োগের এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২২ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে কাজ শুরু করে। দ্রুততার সঙ্গে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে গভর্নর নিয়োগের প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষর শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যায় এবং দুপুরের মধ্যে এই প্রস্তাব অনুমোদন হয়ে মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসে।
মোস্তাকুর রহমান নতুন গভর্নর নিয়োগ হচ্ছেন এই গুঞ্জন ২২ ফেব্রুয়ারি থেকেই ওঠা শুরু করে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি মোস্তাকুর রহমানের ছবি সম্বলিত একটি কারিকুলাম ভিটা (সিভি) টাইমসের হাতে আসে। যদিও এতে মোস্তাকুরের কোনো স্বাক্ষর ছিল না।
যখন নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না আহসান এইচ মনসুর। তিনি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। অর্থমন্ত্রী তখন মনসুরকে আশ্বাস দেন, বিএনপি সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
ওই বৈঠকেও মনসুরকে জানানো হয়নি, তিনি যে আর পদে থাকছেন না। পরের দিন দুপুরে গণমাধ্যমে নতুন গভর্নর নিয়োগের গুঞ্জনের খবর দেখে কার্যালয় ত্যাগ করেন তিনি। ওইদিন নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির আগেই মোস্তাকুর রহমান তার লিংকডইন আইডিতে লেখেন, ‘গভর্নর ডেজিগনেট অ্যাট বাংলাদেশ ব্যাংক।’ এর অর্থ হলো, তিনি গভর্নর হিসেবে মনোনিত হয়েছেন তবে এখনো অফিসে বসেননি।
কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের বালাই না দেখিয়ে একজন গভর্নরকে অপসারন এবং তার পরিবর্তে একজন সোয়েটার কারখানার মালিককে এই পদে বসানোর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার থেকে শুরু করে নেটিজেনদের মধ্যে। পাশাপাশি পেশাদারদের সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম লিংকডইনে নিজের পদ উল্লেখ করা নিয়েও হাসির পাত্র হন নতুন গভর্নর।
একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে পেয়ে বিব্রত বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা টাইমসকে জানিয়েছেন, নীতি সহায়তার আবেদনের শুনানিকালে কিছু কর্মকর্তা মোস্তাকুর রহমানের হিরা সোয়েটারকে সুবিধা দেওয়ার বিরোধীতা করেছেন। এখন তিনি গভর্নর হয়ে আসায় বিব্রত ওই কর্মকর্তারা।
এদিকে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের যেদিন প্রজ্ঞাপন হলো, ওই দিনই পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার পাঁচজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বদলি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পরিস্থিতিতে নতুন গভর্নর নিয়োগে স্বার্থের সংঘাত হয়েছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ রুমী আলী বলেন, ‘স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত রয়েছে, এতে অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারণ নতুন গভর্নর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় অনুমোদিত ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন।’
মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে সুশাসনকর্মীদের পক্ষ থেকেও সমালোচনা এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, নতুন গভর্নর করপোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবেন কি না। এই বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গভর্নরের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘স্বার্থের সংঘাতে জর্জরিত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ টাইমসকে বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকারের আমলে গভর্নর পদে পরিবর্তনটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটাকে যদি গোছালোভাবে করতে পারতো, তাহলে আস্থার সংকট ও সমালোচনা তৈরি হতো না।’
পূর্বের গভর্নরকে অপসারণ ও নতুন গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে ব্যবসায়ী মহলেও। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগের গভর্নরের বিদায় সুখকর হয়নি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ছে। এই বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া দরকার ছিল।
তবে তিনি মনে করেন, ব্যবসায়ী মহল থেকে গভর্নর হওয়ায় সামনে ব্যবসার পরিবেশ ভালো হবে। হাতেম টাইমসকে বলেন, ‘নতুন গভর্নর যেহেতু ব্যবসায়ী জগতের লোক, তাই তিনি এখানকার বিদ্যমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। উনি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পান তাহলে দেশের ব্যবসায়-বিনিয়োগের সুযোগ প্রসারিত হবে।’
তবে একটি বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টাইমসকে বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ থাকে। যেভাবে একজন গভর্নরের বিদায় হলো এবং আরেকজন গভর্নরকে পদে বসানো হলে, এটি বৈশ্বিক সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভালো বার্তা দেয়নি।


