গত কয়েক বছর ধরে যশোরে খেজুরের গুড়ের চড়া দামের কারণে বেশ লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। এবারও শীতের আমেজ শুরু হতেই জেলাজুড়ে গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত ও রস সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েছেন। গ্রামের গাছিরা এখন গাছের ডালপালা ছাঁটাই ও কাণ্ড পরিষ্কার করতে ব্যস্ত।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে মিষ্টি রস সংগ্রহ। সেই রস চুলায় জাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু ঝোলা গুড় ও পাটালি।
ঐতিহ্যবাহী এই গুড়কে কেন্দ্র করে জেলায় শীতের মৌসুমে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বাজার গড়ে ওঠে, যা গ্রামের মানুষের বাড়তি উপার্জনের বড় সুযোগ করে দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে যশোরে খেজুরের রস ও গুড়ের উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে।
চৌগাছা উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের গাছি মোহাম্মদ শফির কাছে শীতকাল মানেই কাজের ব্যস্ততা।
শফি প্রায় ৩৫ বছর ধরে গাছ কাটা, রস তোলা আর গুড় বানানোর কাজ করছেন। বছরের চার থেকে পাঁচ মাস তিনি গাছের যত্ন নেন, রস জাল দিয়ে গুড় বানান এবং তা বাজারে বিক্রি করেন।
তার মতে, ধান চাষের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর চেয়ে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করা অনেক বেশি লাভজনক।
শফি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান মেলে, যা বিক্রি করে পাওয়া যায় ৩০ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। কিন্তু সেচ, সার, রোপণ, মজুরি ও ধান মাড়াতেই ২৫ হাজার টাকার ওপর খরচ হয়ে যায়। সেই ধান তুলতে লেগে যায় চার মাস। অথচ শীতের চার মাসে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে অনায়াসে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ করা যায়।’
যাদের জমিজমা কম, তাদের জন্য খেজুর গাছ কাটা এক বিশাল সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষের বাড়তি খরচ ও ধানের দামের চড়াই-উতরাইয়ের এই সময়ে শীতের এই আয় দিয়ে অনেক গ্রামের পরিবার পুরো বছরের সংসার চালায়।
শফি জানান, গত পাঁচ বছরে গুড়ের দাম ভালো পাওয়ায় তাদের ভাগ্য বদলেছে। তিনি বলেন, ‘আগে গুড়ের দাম কম ছিল। গায়ের ঘাম রক্ত পানি করেও সঠিক দাম পেতাম না। তবে গত পাঁচ বছরে দাম বেশ ভালো। গত মৌসুমে আমি ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছি।’
শুধু শফি নন, যশোরের হাজারো গাছি এখন শীতের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, যখন রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ধুম পড়ে যাবে।
কৃষি অধিদপ্তর জানায়, যশোরে মোট ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫টি খেজুড় গাছ আছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৭ হাজার ১৩০টি গাছ থেকে রস পাওয়া যায়। এই জেলায় শীতকালে রস ও গুড়ের বাজারের আকার দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকায়।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, চমৎকার স্বাদের কারণেই যশোরের খেজুর গুড়ের এত সুনাম ও চাহিদা।
তিনি বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে ১৫০ কোটি টাকার রস ও গুড় বিক্রি হয়, যা আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।’
তিনি আরও জানান, গাছিরা যাতে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপায়ে রস ও গুড় তৈরি করতে পারেন, সে জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলেই গত পাঁচ বছরে রস ও গুড় উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে।


