কোরবানি হওয়া থেকে বেঁচে যাওয়া অ্যালবিনো জাতের সাদা রঙের মহিষটি কি চিড়িয়াখানায় আসলে ভালো আছে?-এই প্রশ্ন এখন জোরেশোরে উঠতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে চিড়িয়াখানা থেকে সরিয়ে তাকে আবার খামারে ফেরানোর দাবিও উঠছে সামাজিক মাধ্যমে।
খামারে অনেক সঙ্গীর সঙ্গে বড় হয়ে উঠা মহিষটিকে ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিডিয়াখানায় একাকী থেকে অনেকটাই মনমরা মনে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক পরিচালক বলছেন, অনেক মানুষ দেখে প্রাণীটি চাপে আছে, যদিও কিউরেটরের দাবি, প্রাণীটি ভালোই আছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সায়েদা বেগম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘গৃহপালিত একটি প্রাণীকে চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের জন্য রাখা কতটা প্রয়োজনীয়, সেটিও আলোচনার বিষয়।’
মহিষটির ম্রিয়মান হয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় একা রাখা হলে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। একই প্রজাতির অন্য সদস্য বা সঙ্গী থাকলে সাধারণত এই ঝুঁকি কমে।’
এবারের কোরবানির ঈদে বাংলাদেশ তো বটেই সারা বিশ্বেই পরিচিতি পেয়েছে এই মহিষটি। নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে থাকার সময়ই একে মজা করে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নাম দেওয়া নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়।
এই মহিষটির গায়ের রং কেবল সাদা নয়, তার মাথায় সোনালী চুল আছে। তার চোখ আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চোখের মধ্যেও মিল খুঁজে পেয়েছিলেন খামার মালিক। এরপর তিনি মাথার চুলগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের স্টাইলের অনুকরণে আঁচড়ে দিতেন।
মহিষটি কোরবানিতে বিক্রি হয়ে যাওয়ার মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামকরণের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়। এর মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নির্দেশে সেটি এর ক্রেতার বাড়ি থেকে থানায় নেওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়। পরে এর স্থান হয় ঢাকা চিড়িয়াখানায়।
সরকারের তরফে দাবি করা হয়, এটি বিরল জাতের মহিষ, তাই একে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে নারায়ণগঞ্জের যে খামারে সেটি বড় হয়েছে, সেখানে এখনও এই জাতের ১০টি মহিষ রয়ে গেছে বলে টাইমসকে জানিয়েছেন খামার মালিক জিয়া উদ্দিন।
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মহিষটি খামারে যেভাবে ছিল, এখানেও সেভাবেই পরিচর্যা করা হচ্ছে। খামারে তাকে দিনে তিনবার গোসল করানো হতো, এখানেও তিনবার গোসল করানো হয়। যে খাবার খাওয়ানো হতো এখানেও সেভাবেই খাওয়ানো হয়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মনিরুল এইচ খান অবশ্য মনে করেন, নতুন পরিবেশে প্রাণীর কিছু আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিলেও একা রাখার কারণে তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়।
তিনি বলেন, ‘খামারে যেভাবে রাখা হয়েছিল, বর্তমান পরিবেশ তার থেকে ভিন্ন হতে পারে। তবে শুধু একা রাখার কারণে এত দ্রুত বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার কথা নয়।’
চিড়িয়াখানায় রাখার যৌক্তিকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যদি মানুষের আগ্রহ বা প্রদর্শনের চাহিদা থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ সেটি বিবেচনা করতে পারে।’
প্রাণীটির ঝিমিয়ে থাকা বা নিস্তেজ আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় চিড়িয়াখানার সাবেক পরিচালক আব্দুল লতিফ বলেন, পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে সাময়িকভাবে এমনটি হতে পারে।
‘হঠাৎ পরিবেশ পরিবর্তন, নতুন জায়গায় স্থানান্তর এবং প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি প্রাণীটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ভিড় বা কৌতূহলী মানুষের উপস্থিতির কারণেও প্রাণীটি স্ট্রেস অনুভব করতে পারে, যার প্রভাব আচরণে দেখা যেতে পারে,’ বলেন তিনি।
মহিষ একটি দলবদ্ধ প্রাণী। এখন একা রাখা হলেও, ভবিষ্যতে সঙ্গীর ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সঙ্গীর ব্যবস্থা করা হবে কি না এই প্রশ্নে কিউরেটর হাবিবুর বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আদেশ দিলে আনা হবে।’


