কী বলল রাজনৈতিক দলগুলো

কী বলল রাজনৈতিক দলগুলো
সংসদ অধিবেশনে বাজেট বকতৃতা দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। ছবি: ভিডিও থেকে
Advertisement
Advertisement

সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেট নিয়ে দেশজুড়ে এখন তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। কেমন হলো এবারের বাজেট? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন কি ঘটল এতে? বাজেটকে ঘিরে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আসছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

ক্ষমতাসীন দল একে ‘উন্নয়নমুখী ও সংকট উত্তরণের বাজেট’ বলে স্বাগত জানালেও, বিরোধী দলগুলোর দাবি–এটি ‘জনসাধারণের পকেট কাটার’ এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ একটি দলিল।

বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।

সিপিবি

লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থের এই বাজেট ‘বাস্তবায়ন করা কঠিন’ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন।

প্রস্তাবিত বাজেট পেশের পর তিনি বলেন, এত বড় বাজেট আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘাটতি বাজেট দেখানো হচ্ছে। এই টাকাটা তো আমাদের সাধারণ মানুষের ওপর কর চাপিয়ে করা হবে।

যদিও বাজেটে বলা হয়েছে যে নিত্যপণ্যের দাম কমবে; কিন্তু বাংলাদেশে তো দাম কখনো কমে না এবং ওই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমদানিকারক ব্যবসায়ীদেরই আবার সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সিপিবি সভাপতি বলেন, এই বাজেটে আমাদের শ্রমিকের মজুরি, ন্যূনতম মজুরি কত হবে? তারপর কৃষকের সমবায় কিংবা হিমাগার বা ধানের দাম কীভাবে নির্ধারণ হবে–এই বিষয়গুলো তো সুস্পষ্ট করা হয় নাই। এই বাজেটে আমাদের কর্মসংস্থানের কোনো চিন্তাভাবনাও ওভাবে নেই।

তিনি বলেন, কোটি কোটি বেকার, সেই বেকারত্ব কীভাবে দূর হবে, সেই কথা তো বাজেটে উল্লেখ করা হয় নাই। সার্বিকভাবে ঘুরেফিরে অতীতে সরকারগুলো যে ধরনের বাজেট তৈরি করেছে, ধনিক শ্রেণির স্বার্থে, লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থে এবারও বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, এটা বাস্তবায়ন করা কঠিন।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রস্তাবনায় ‘সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণের আধাআধি প্রচেষ্টা রয়েছে’, সমাজের নানা অংশকে তুষ্ট করার চেষ্টা আছে।

তবে বিশাল অঙ্কের ঘাটতি বাজেটের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তাবে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতাও বেড়ে যাবে। টাকার অঙ্কে বাজেটের আকারে বড় উল্লম্ফন ঘটলেও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে। তবে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, করদাতাদের আওতা বৃদ্ধি ও তা সংগ্রহের দক্ষতা দেখাতে পারলে এই রাজস্ব তুলে আনা অসম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, বাজেটে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তার জন্য অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগেই যথাসম্ভব প্রণোদনা জোগানো প্রয়োজন।

বন্ধ কলকারখানা চালু ও উৎপাদনমুখী শ্রমঘন নতুন শিল্পোদ্যোগ হবে বাজেটের মনোযোগের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনীতে বাজেট প্রস্তাবনা ইতিবাচক হলেও এসব প্রকল্প আখেরে দারিদ্র্য বিমোচন ঘটাবে না। তার জন্য প্রয়োজন আত্মকর্মসংস্থানের উৎপাদনশীল বহুমুখী উদ্যোগ।

এ ছাড়া খাদ্যপণ্যসহ নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাজেটে আশাব্যঞ্জক প্রস্তাবনা দেখা যাচ্ছে না। এবারও বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার পুরনো ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসব তৎপরতা প্রকারান্তরে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে নতুন করে উৎসাহ জোগাবে, যোগ করেন তিনি।

বাসদ

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, এই বাজেটে আশাবাদ আছে তবে অভিজ্ঞতার শিক্ষা নেই। এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা হয়েছে কিন্তু আর্থিক সংস্থান পরিকল্পনা সেই পুরনো পথেই রয়েছে। অর্থাৎ ধনীদের প্রত্যক্ষ করের তুলনায় সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ কর চাপিয়ে বাজেটের টাকার সংস্থান করা হবে।

ফলে বাজেট ঘাটতি, দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণ, ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ বরাদ্দ এবং কথার চমক রয়েছে এই বাজেটে।

তিনি বলেন, গত অর্থবছরে কেন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় নাই, কেন ঋণখেলাপিদের টাকা আদায় করা যায়নি, কেন ব্যাংক খাত সচল ও শক্তিশালী করা যায় নাই, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি খাতে দুর্নীতির চক্র না ভেঙে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি দামের বোঝা চাপাতে হয়েছে—সেই পর্যালোচনা খুব জরুরি ছিল।

কিন্তু তার প্রতিফলন অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নাই। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক-কৃষকের আয় বাড়ছে না, অথচ সরকারি হিসেবে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে, যা বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

দেশের জনগণ প্রতিশ্রুতি অনেক শুনেছে; তাই বাজেট অধিবেশনে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণমূলক প্রতিটি খাত আলোচনা করে বাজেটের দুর্বলতা দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় পার্টি

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়; বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা কখনোই অর্জিত হবে না। ফলে সরকার ডেভেলপমেন্ট বাজেট (এডিপি) ঋণ করে করবে; এমনকি সরকারি রেভিনিউ বা রাজস্ব বাজেটও দেখা যাবে লোনের ভিত্তিতেই করতে হবে।

এটা অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি যদি বেতন বাড়ানো হয়, পে-স্কেল ইমপ্লিমেন্ট হয়, তা বেসরকারি খাতকে প্রচণ্ড চাপে ফেলবে। আমরা প্রচণ্ড মূল্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা বাজেটে নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঠিক দিকনির্দেশনাও নেই।

তিনি আরও বলেন, চর এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বা চর ফাউন্ডেশন করার যে দাবি, সেটার কোনো নির্দেশনা এখানে নেই, বাজেট বরাদ্দও কম দেওয়া হয়েছে। এখানে আরও অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল।

জেএসডি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে আয়বৈষম্য মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রতিফলিত হয়নি বলে জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) শীর্ষ নেতারা।

দলটির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বাজেটে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান সংকট এবং আয়বৈষম্য মোকাবিলায় সুস্পষ্ট ও কার্যকর দিকনির্দেশনা পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

করের আওতা সম্প্রসারণ রাষ্ট্রের প্রয়োজন হলেও সেই প্রক্রিয়া যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি, অবৈধ অর্থ পাচার এবং অপ্রদর্শিত সম্পদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সংস্কৃতি, সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কর-সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এসব সুবিধার প্রকৃত সুফল যেন শুধু বৃহৎ করপোরেট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণ উদ্যোক্তা, শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও উদ্ভাবকদের কাছেও পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad