সাধারণভাবে মনে করা হয়, শিশু যখন স্কুলে যায় তখন তার বিকাশ শুরু হয়। তবে গবেষণা বলছে, জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত, বিশেষ করে জীবনের প্রথম ১০০০ দিনে, শিশুর মস্তিষ্ক বিকশিত হয় সবচেয়ে দ্রুত। এই সময়েই মস্তিষ্কের সারাজীবনের প্রায় ৯০ শতাংশ স্নায়ু সংযোগ তৈরি হয়। তাছাড়া দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কমবয়সী প্রায় ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। দেশজুড়ে শিশুমৃত্যুর একটি প্রধান কারণও এটি। তারপরও গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এই সময়ে নিরাপত্তা ও যত্ন নিশ্চিত করা সবসময় একটি কঠিন বিষয়।
এই জায়গাতেই নীরব কিন্তু কার্যকর ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ সরকারের ‘চাইল্ডকেয়ার সেন্টার’ বা কমিউনিটি শিশু যত্নকেন্দ্র প্রকল্পটি। বর্তমানে ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় এই কেন্দ্রগুলো পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ দিবাযত্নের সুযোগ এনেছে। পাশাপাশি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে এসব সেন্টারে।
এদিকে ‘নিরাপদ সাঁতার’ প্রকল্পটি করা হয়েছে ছয় থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জন্য। এই প্রকল্পে তাদের সাঁতার শেখানো হয়। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যদি অভিভাবকের ব্যস্ততার সময়ে শিশুদের কমিউনিটি দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখা হলে ডুবে মৃত্যুর হার ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় ৫০০টি কেন্দ্রে এমন ১২ হাজারেরও বেশি শিশুকে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এটি জেলার একমাত্র উপজেলা যেখানে এই প্রকল্প চালু আছে। তাতে পুরো গ্রাম এলাকায় বেশ দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সেখানকারই বাসিন্দা মাসুদা বেগম প্রতিদিন সকালে কাজে যাওয়ার আগে চার বছরের ছেলে রাফিদকে এমন এক সেন্টারে রেখে যান। তিনি বলেন, ‘আমি যখন কাজে থাকি তখন আমার ছেলে এখানে থাকে। সে শেখে, খেলে আর নিরাপদ থাকে। এখন আর তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।’
তিন বছরের নওশিনের দাদি সাহেরা বেগম হাসিমুখে বলেন, ‘এখানে আসার পর ও আর বাড়ি ফিরতে চায় না। শিক্ষকরা ওদের নিজের সন্তানের মতো যত্ন নেয়।’
কমিউনিটি ডে-কেয়ারের সাফল্যের মূল কারণ সেখানকার কেয়ারগিভার বা সেবাদানকারীরা। মনোহরদীর চন্দনবাড়ি গ্রামের কেয়ারগিভার কামরুন্নাহার নিজের জমির একটি অংশ দান করেছেন এই কেন্দ্র গড়ার জন্য। তিনি বলেন, ‘শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার ভালো লাগে। যদি দেখি কোনো শিশুর বিকাশ অন্যদের তুলনায় ধীর, তাহলে আমরা তাদের বাবা-মার সঙ্গে কথা বলি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলি এবং শিশুর বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিই।’
এসব গল্পই বলে দেয় কেন ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড চাইল্ডকেয়ার (আইসিবিসি) প্রকল্পটি অনন্য। প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাদির জানান, আরও ১৫ জেলায় এ প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকার শিশুরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, দরিদ্র ও ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি—যেমন সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, বাগেরহাট, চাঁদপুর ও ভোলা। সেইসব এলাকায় আমরা কাজ করতে চাই।’
কাদির যোগ করেন, প্রকল্পে শিগগিরই শিশুদের চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়টি যুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, ‘অনেক শিশু সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারায়। প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৭ জনের দৃষ্টিতে সমস্যা থাকে। যদি পাঁচ বছর বয়সের আগে তা শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়া যায়, তাহলে আরোগ্য পাওয়া সম্ভব।’
এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরেই। তবে সরকার এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিশু যত্ন নিয়ে কাজ করা সাইনারগস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ঈশা হোসেন বলেন, এ প্রকল্প গ্রামবাসীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সবচেয়ে অনুপ্রেরণার বিষয় হলো— জনগণই এর মূল্য বুঝতে পেরেছে এবং সেখানে স্বেচ্ছায় ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পে প্রায় দুই লাখ শিশু সরাসরি উপকৃত হচ্ছে, আর তাদের পরিবারের মাধ্যমে আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে—মোট হিসাবে যা প্রায় পাঁচ লাখ।’
যৌথ উদ্যোগ কীভাবে বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুতোষ জীবনকে নতুনভাবে গড়তে পারে তা নতুন করে দেখায় এ প্রকল্প। প্রাথমিক শিক্ষা ও যত্নের ওপর জোর দিয়ে এই কেন্দ্রগুলো একটি সুস্থ, সক্ষম প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপনের কাজ করছে। সেটাই প্রকাশ পায় সেখানকার এক কর্মীর ভাষায়। তিনি বলেন, ‘আমরা শিশুদের জন্য শুধু এটুকুই চেয়েছি।’


