জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে যখন বাংলাদেশ নতুন পথে এগোতে শুরু করেছে, তখনও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্দরমহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ কি আবার দেশের অর্থনীতিতে ফিরে আসার পথ খুঁজছে?
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কয়েকজন বিতর্কিত ব্যবসায়ী দেশ ছাড়েন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ছিল এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম।
নতুন সরকারের ওপর ভর করে এস আলম গ্রুপের ফিরে আসার জল্পনার পেছনে রয়েছে একাধিক ঘটনা ও ইঙ্গিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শোনা যায় – বিএনপির প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ আবারও তাদের ব্যবসায়িক প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
সন্দেহের জাল
আলোচিত গ্রুপটি নিয়ে সন্দেহের বিষয়টি আলোচনায় আসে যখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য গোপনে এস আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি টেলিকম কোম্পানির শেয়ার কেনেন। জাতীয় নির্বাচনের পর ওই নেতা বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, যাতে সন্দেহ আরও তীব্র হয়েছে।
এস আলম গ্রুপ নিজেই এখন বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক তদন্তের মুখে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রায় ১.১৩ লাখ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে এস আলম পরিবারের বিভিন্ন সম্পদ ও শেয়ার জব্দ করা হয়েছে এবং কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে গ্রুপটির সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় যখন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন। কক্সবাজারে নিজের নির্বাচনী এলাকায় ফেরার দিন তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন একটি গাড়িতে ওঠেন, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না এবং তার এক কর্মী ওই গাড়িটি ব্যবহার করতেন, যিনি এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়িক বিষয় দেখাশোনা করেন।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তনও এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সরকারের চুক্তি বাতিল করে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংক খাতের কিছু বড় স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। বিশেষ করে যে পাঁচটি দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা ছিল, তার চারটিই এক সময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল – ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংক ছিল আরেক বিতর্কিত ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন গভর্নরের সঙ্গে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সংযোগের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, মোস্তাকুর রহমান ২০১০ সাল থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইনটেক লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্পনসর শেয়ারহোল্ডার এবং সেখানে তার প্রায় ০.৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। কোম্পানিটির কয়েকজন পরিচালক ও শেয়ারধারীর সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন। জানা গেছে, ইনটেক লিমিটেডের বড় অংশের শেয়ার কিনে নেওয়ার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটিতে প্রভাব বিস্তার করেছিল এস আলম পরিবার।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের বড় আর্থিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তা নিয়ন্ত্রকের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘গভর্নর পদে পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংক মার্জারের ইস্যু জড়িত থাকতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, ‘তার নিয়োগে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে কি না– এই প্রশ্নটি যৌক্তিকভাবেই উঠবে।’
স্বার্থের সংঘাত
গভর্নর পরিবর্তনের পদ্ধতি ও নতুন গভর্নর বাছাই নিয়ে সুশাসনকর্মীদের কাছ থেকেও সমালোচনা এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ২৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘স্বার্থের সংঘাতে জর্জরিত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’
গভর্নর পরিবর্তনের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কয়েকশ কর্মকর্তা বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ ও মিছিল করেন এবং দাবি না মানলে গভর্নরের পদত্যাগ দাবিতে কলম বিরতি কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ওই পরিস্থিতির পরপরই সংবাদ সম্মেলনে আহসান এইচ মনসুর দাবি করেছিলেন, আন্দোলনের পেছনে একটি সংগঠিত গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ ছিল আহসান এইচ মনসুরের। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের মাত্র এক ঘণ্টা পরই নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর প্রকাশ হলে তিনি কার্যালয় ত্যাগ করেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের কয়েকজন টাইমসকে বলেন, তাদের ধারণা সরকার হয়তো চলমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দ্রুত গভর্নর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যেও পরে অনুশোচনার কথা শোনা গেছে।
এরই মধ্যে এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে নতুন বার্তাও এসেছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো টাইমসকে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে আবার পূর্ণমাত্রায় ব্যবসা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এস আলম গ্রুপের মুখপাত্র বোরহান উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমাদের চেয়ারম্যান দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন এবং এখনো চান। কীভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে সব কারখানা সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে নতুন গভর্নরের নীতিগত বার্তারও মিল দেখা যায়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। এতে এস আলম গ্রুপের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের বক্তব্য জানতে প্রায় এক সপ্তাহ চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, ‘গভর্নরের ব্যক্তিগত বিষয় আমার এখতিয়ারবহির্ভূত হওয়ায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’
নতুন সরকারের জন্য এসিড টেস্ট?
এস আলম ইস্যু এখন শুধু একটি করপোরেট বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে নতুন সরকারের শাসনব্যবস্থা, আর্থিক জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক নীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সদরদপ্তর থাকা এই শিল্পগোষ্ঠী এক সময় ব্যাংকিং, পণ্য বাণিজ্য, জ্বালানি, শিপিং এবং উৎপাদন খাতে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, আটটি ব্যাংকে প্রভাব এবং বড় আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর গ্রুপটির ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত হয় এবং বেশিরভাগ করপোরেট কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মীদের বেতন দেওয়া অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
কানাডা থেকে ফোনালাপে গ্রুপটির মুখপাত্র বোরহান উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাদের প্রায় ২০ হাজার কর্মীর কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি, যদিও এলসি-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন স্থগিত রয়েছে।
তবে অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে তিনি নির্দিষ্ট কিছু বলেননি। তার ভাষায়, ‘এস আলমের মতো বড় আর্থিক গ্রুপের জন্য কর্মীদের বেতন দেওয়া বড় কোনো সমস্যা নয়।’
অন্যদিকে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গ্রুপটির সদরদপ্তরে আগের তুলনায় কিছুটা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগের মুখে থাকা একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিগত শিথিলতা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবুও ব্যবসায়িক মহলে ধারণা রয়েছে, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতি বিবেচনায় সরকার হয়তো সম্পূর্ণ ভেঙে না দিয়ে কোনো মধ্যপন্থা খুঁজতে পারে।
এরই মধ্যে সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে আন্তর্জাতিক সালিশকারী নিয়োগ করেছে এস আলম গ্রুপ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় ক্ষতিপূরণ দাবি করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
কর্মসংস্থান ও সামাজিক চাপ
এই বিতর্কের আরেকটি বড় দিক রয়েছে মাঠপর্যায়ে। চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু পরিবার এক সময় এস আলম গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
অভিযানের পর ব্যাংক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কর্মী চাকরি হারান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পটিয়ার বিএনপি সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক এনাম টাইমসকে বলেন, গ্রুপটির পতনের কারণে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং তাদের অনেকেই এখন নীরবে প্রতিষ্ঠানটির পুনরুজ্জীবন চান।
স্থানীয় বাসিন্দা এটিএম তোহা বলেন, ‘এই গ্রুপ স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান, দান-অনুদান ও অবকাঠামো ঘিরে একটি বড় অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করেছিল। এর হঠাৎ পতনে এলাকায় বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।’
অন্যদিকে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এটি শুধু কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করার প্রশ্ন নয়। অনেক মানুষের জীবিকা এখানে জড়িত। আমরা স্থিতিশীলতা চাই।’
শেষ পর্যন্ত এস আলম গ্রুপ ফিরে আসবে, পুনর্গঠিত হবে নাকি স্থায়ীভাবে প্রভাব হারাবে – তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো এই সংকট সরকার কীভাবে মোকাবিলা করে। কারণ সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে সংস্কার, জবাবদিহি এবং আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়ে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা।


