খাগড়াছড়িতে এক স্কুলশিক্ষার্থী ধর্ষণের প্রতিবাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়ি ছাত্র-জনতার সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার পর এবার তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিয়েছে জুম্ম ছাত্র-জনতা। এই তিন পার্বত্য জেলা হলো রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি।
রোববার রাতে এক ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। শনিবার থেকে খাগড়াছড়িতে ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলছে।
ফেসবুক পোস্টে জুম্ম ছাত্র-জনতা বলছে, ‘গত কয়েকদিনে খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে সেনাবাহিনীর ব্যাপক তল্লাশি, মারধর ও ধারপকড়ের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে- যা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। তদুপরি গুইমারায় জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং সেটেলারদের দ্বারা দোকানপাট ও বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নির্মম প্রতিবেদন এসেছে। সেনা ও সেটেলারদের হামলায় চারজন নিহত এবং বহুজন আহত হয়েছেন। আমরা এই বর্বরতা ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি কঠোরভাবে নিন্দা জানাই এবং প্রতিবাদ করছি।’
এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দলমত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’। তবে এই প্রতিরোধ যেন আইনগত, শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতেও বলা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় মারমা জনগোষ্ঠীর এক স্কুলছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে খাগড়াছড়ি সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। পরদিন বুধবার সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সন্দেহভাজন যুবক শয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এই ধর্ষণের প্রতিবাদে শুক্রবার আধাবেলা ও শনিবার সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের ডাক দেয় পাহাড়ি সংগঠনগুলো। তবে অবরোধে পরিস্থিতি অবনতি হলে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, সদর উপজেলা ও গুইমারায় জারি করা হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা। ১৪৪ ধারার ভেতরেই শনিবার সন্ধ্যায় জেলা সদরে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতে জড়ালে বেশ কয়েকজন আহত হন। এর জেরে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ এই অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাকা দেয়।
অবরোধ চলাকালে রোববার দুপুরে গুইমারার রামেসু বাজারে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ও সংলগ্ন কয়েকটি বাড়িঘর পুড়ে যায়। দুপুরে স্থানীয়দের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে গুলির শব্দ পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনজন নিহতের ঘটনায় দুঃখও প্রকাশ করেছে।
আট দফা দাবি জানিয়ে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় আমাদের সড়ক অবরোধ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হলো এবং সকল পর্যটন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকবে।’
যে আটটি দাবি জানানো হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, ধর্ষণ মামলার বাকি দুই আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে তিন আসামিরই যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীকে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তার পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
শনি ও রোববার খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের ঘটনাসহ সব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত নিশ্চিত করা।
জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হামলা, দোকানপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগে যে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ক্ষতিপূরণেল ব্যবস্থা করা।
চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আটক সব জুম্ম ছাত্র-জনতার অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি এবং ১৪৪ ধারা বাতিল।
এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর এবং সুসংগঠিত আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’।


