চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় বৃহত্তম এই সমুদ্রবন্দরের জাতীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) চুক্তিতে টার্মিনাল দুটির পরিচালনভার হস্তান্তরের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হ্যান্ডলিং করে। এর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কেবল বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
তিনি অভিযোগ করেন, পিপিপি কাঠামোর অধীনে দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনা কমিটিকে সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ১২ সদস্যের একটি দল গঠন করেছে।
কমিটির মতে, নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এনসিটি ও সিসিটি দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউএস (কনটেইনার পরিমাপের একক)। অথচ বর্তমানে টার্মিনালটি বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। গত মে মাসেই টার্মিনালটি রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। বক্তারা একে দেশি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ৩৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি খরচ বাড়বে। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ই আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।
বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিদেশি অপারেটরদের ইজারা দিলে বন্দরের আয়ের বড় অংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিদেশে চলে যাবে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত। এনসিটি ও সিসিটির মতো প্রধান টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে কমিটি। দাবিগুলো হলো- এনসিটি ও সিসিটি দেশি-বিদেশি কোনো কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল করা। সব টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় রাখা। বন্দর-সংক্রান্ত সব চুক্তি প্রকাশ করা। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো গোপন চুক্তি সই না করা। চট্টগ্রাম বন্দরের জাতীয় মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করা।
পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়ার চর প্রকল্প-সংক্রান্ত সব চুক্তি প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
টার্মিনাল দুটি ইজারা দেওয়ার প্রস্তাবের প্রতিবাদে ৩০ জুন সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে সমাবেশ ও মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কমিটি। কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লা বাহার, প্রকৌশলী সুভাশ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তাসলিম হোসেন সেলিম ও বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।


