জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় এখন যেন সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপছে। নতুন ব্যবস্থায় জন্মতারিখের মতো সামান্য সংশোধন করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
জন্মতারিখ সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের পর এখন এই সংশোধনের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের অধীনে নেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকদের সামান্য সংশোধনের জন্যও রাজধানী ঢাকায় আসতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি না দিয়ে কেন পুরো প্রক্রিয়াটিকেই জটিল করা হলো?
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা রিতু আক্তার এ ভোগান্তির শিকারদের একজন। জন্মতারিখে মাত্র দুই মাসের অসঙ্গতি তার জন্য দীর্ঘ দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। নির্বাচন কমিশনে বারবার গিয়েও এখনো তিনি কোনো সমাধান পাননি এবং এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরে এনআইডি সংশোধনের চেষ্টা করছি। আমার বয়সে মাত্র দুই মাসের পার্থক্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসতে হয়েছে। প্রথমে স্থানীয় অফিসে কয়েক দিন গিয়েছি, পরে আমাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়। এখন এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরছি।’
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন ষাটোর্ধ্ব আশিক প্রামাণিক। তিনি মানিকগঞ্জ থেকে নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন ছেলের এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধন করতে। তার ছেলে রুবেল প্রামাণিক মালয়েশিয়ায় কর্মরত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধন না হলে তার ভিসা নবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘দেড় মাস ধরে নির্বাচন কমিশনে আসছি। আমার ছেলের ভিসার মেয়াদ আর ১০ দিন আছে। সংশোধন না হলে তাকে দেশে ফিরতে হবে। আমাদের পুরো পরিবার তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামও একই সমস্যায় পড়েছেন। তার প্রকৃত জন্মসাল ২০০৪ হলেও এনআইডিতে তা ২০০৮ উল্লেখ রয়েছে, যা তার শিক্ষাগত নথির সঙ্গে মিল নেই। সংশোধনের জন্য তাকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থেকে ঢাকায় আসতে হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক নীতিমালার পরিবর্তনের কারণেই এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। আগে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষমতা ছিল—উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ তিন বছর, অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা পাঁচ বছর, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সাত বছর, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা আট বছর এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত সংশোধন করতে পারতেন। ফলে বেশিরভাগ আবেদন স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত নিষ্পত্তি করা যেত।
কিন্তু নতুন নিয়মে এই ক্ষমতা প্রত্যাহার করে মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে এবং আবেদনকারীদের ওপর চাপ বেড়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, মাঠপর্যায়ে জন্মতারিখ সংশোধনে ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগ ওঠায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুরো ব্যবস্থাই পরিবর্তন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে এবং ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এএসএম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জন্মতারিখ সংশোধন নিয়ে মাঠপর্যায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল। সচিব প্রায় প্রতিদিনই এমন অভিযোগ পাচ্ছিলেন। অনিয়ম ঠেকাতে সচিবালয় পর্যায় থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, শুরুতে কিছু অসুবিধা থাকলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং এনআইডি সংশোধনে নাগরিকদের আর ঘুষ দিতে হবে না।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ বলেন, আগের ব্যবস্থায় সংশোধনের সুযোগ বেশি থাকায় আবেদনও বেশি হতো। তিনি বলেন, এখন যাচাই প্রক্রিয়া সেন্ট্রালাইজড হওয়ায় এ প্রবণতা কমবে। অনিয়মও হ্রাস পাবে। তবে জনভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


