বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং একটি সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় ব্যাংকের মূল শাখা থেকে দূরে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে এই ধারার ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে এটি এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যকর কিনা, সেই প্রশ্ন এখন আর কেউ করে না। এখন বং খোঁজ নেওয়া হয় যে, ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যেও এই সেবাটি মানুষের নির্ভরতা অর্জন করতে পারছে কিনা।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত। ২০১৮ সালে সারাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সংখ্যা ছিল সাত হাজারের কম। গত বছরের অক্টোবরের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫২৫টিতে।
সেইসব লাখো মানুষ যারা শহরাঞ্চলের বাইরে বসবাস করেন তাদের কাছে ব্যাংককে নিয়ে গেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। এই আউটলেটগুলো গ্রামীণ বাজার, ইউনিয়ন সেন্টার এবং উপ-শহরগুলোতে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে সাধারণ ব্যাংক শাখা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না।
২০১৮ সালে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৫০ হাজার, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে বেড়ে দুই কোটি ৫৬ লাখের বেশিতে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকসংখ্যার এই উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে, এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে। অনেক গ্রাহকই এজেন্ট ব্যাংকিংকেই মূল ব্যাংক হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।
আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকেও এজেন্ট ব্যাংকিং এখন আর কেবল ক্ষুদ্র লেনদেনের বিষয় নয়।
২০১৮ সালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানতের স্থিতি ছিল ৩০ হাজার ১০০ কোটি, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেড়ে ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এই আমানতগুলো ক্ষুদ্র ও নিয়মিত জমা থেকে আসে ঠিকই, কিন্তু সম্মিলিতভাবে এগুলো ব্যাংকের তহবিলের একটি বিরাট উৎস।
এজেন্ট ব্যাংকিং এখন আর শুধু ছোট ছোট লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন প্রকৃত আর্থিক গুরুত্ব বহন করে।
অবশ্য আমানতের মতো ঋণের প্রবৃদ্ধি একই গতিতে হয়নি। ২০১৮ সালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ হাজার ১৪০ লাখ টাকা।
যদিও বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বর নাগাদ প্রায় ৬ লাখ ২১ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে, কিন্তু এই চ্যানেলের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের তুলনায় এটি এখনও নগস্য।
এই বৈসাদৃশ্যটি এটি স্পষ্ট করে যে, এজেন্ট ব্যাংকিং সঞ্চয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠলেও গ্রামীণ ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ঋণ হিসেবে সেই অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এজেন্টদের মাধ্যমে অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে, কিন্তু ঋণের আকারে তার খুব সামান্যই বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে।
লেনদেনের পরিমাণ দেখেই বোঝা যায় এই ব্যবস্থাটি ক্রমে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে এজেন্ট আউটলেটগুলো ৮৭৭ লাখ ৭০ হাজার লেনদেন পরিচালনা করেছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৮২০ লাখ।
মূল্যমানের দিক থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৭ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তিন বছর আগে যা ছিল ৩৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ হলো, বর্তমানে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রমের একটি বড় অংশ পরিচালনা করছে এজেন্ট ব্যাংকিং। ২০২৪ সালে এই ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের মোট পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এজেন্ট ব্যাংকিং পুরোপুরি ব্যাংকের মূল সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। এজেন্ট আউটলেটের লেনদেনগুলো রিয়েল-টাইমে করা হয় এবং সরাসরি ব্যাংকের মূল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে রেকর্ড হয়ে যায়। এর অর্থ হলো এজেন্ট ব্যাংকিং কোর ব্যাংকিংয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
কোনো এলাকায় এজেন্ট আউটলেট সচল না থাকলে সেখানকার মানুষ কার্যত মৌলিক ব্যাংকিং পরিষেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
দেশজুড়ে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সংখ্যা বাড়লেও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় নগদ টাকার সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা নেটওয়ার্ক সমস্যা লেনদেন ব্যাহত করে।
২০২৫ সালের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৯টিই ছিল বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভূমিকা এখানে এখনো অত্যন্ত সীমিত।
এজেন্ট ব্যাংকিং মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে ব্যাংকিং সেবাকে। লাখো মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার অংশ করতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে, এর ক্রমবর্ধমান পরিধি নতুন ঝুঁকি ও দায়িত্বও তৈরি করেছে। এগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা হবে তার ওপরই নির্ভর করবে এজেন্ট ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি হয়ে থাকবে নাকি ক্রমবর্ধমান চাপের একটি উৎস হয়ে দাঁড়াবে সেই বিষয়টি।


