আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বিকালে ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের সময়ে মানবতা, মানবিকতা এবং দেশের আবহমান কালের ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে একেবারেই বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আজকের অনুষ্ঠানে আমি পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এই ধরনের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমান সরকার রামিসার এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি ইনশাল্লাহ আগামী এক মাসের মধ্যেই নিশ্চিত করবে। সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।’
বাংলাদেশ ও নজরুল এক অবিভাজ্য সত্তা
‘বাংলাদেশ এবং কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি, আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক এবং আমাদের জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ। জাতীয় কবির জন্মদিনে আমরা অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বিভেদের গ্লানি মুছে ফেলি এবং সবার আগে বাংলাদেশকে ধারণ করি।’
গত দুই দশক জাতীয় কবিকে জাতীয় পর্যায় থেকে সম্মান না জানানোর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৬ সালের পর থেকে জাতীয় কবির অমর স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী উদযাপন হয়নি। প্রায় দুই দশক পর পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী আয়োজন করতে পেরে সরকার গৌরববোধ করছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহকে স্মরণ করেন, যিনি ১৯১৪ সালে নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

জাতীয় কবির প্রতি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যদি আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ কিংবা বরণ করতে না পারি, তবে সেটি তাদের নয়, জাতি হিসেবে আমাদেরই দৈন্যতা প্রকাশ করে। এ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানে না, ১৯৭৬ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় কবির নামাজে জানাজার পর কবির লাশবাহী খাটিয়া যারা কাঁধে বহন করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।’
১৯৭৯ সালের ২৫ মে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকার ফার্মগেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির মাজার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একটি র্যালিতেও অংশ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ত্রিশালে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এভাবে জাতীয় কবির প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে কাউকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান নষ্ট হয় না, বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এইসব কালজয়ী আদর্শ থেকে দূরে চলে যাওয়ার কারণেই বর্তমানে আমাদের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় দৃশ্যমান হচ্ছে।
কবির আবির্ভাব আলোকবর্তিকার মতো
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তার রচনার মধ্যে মহিমাময় হয়েছে।’
তিনি বলেন, বিপ্লব-বিদ্রোহ কিংবা রণসংগীত, ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান, অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামা সংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উন্মাদনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।
কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয় এবং বাংলা সাহিত্যের এক নতুন রুচির বিপ্লব। তিনিই কবিতায় এনেছেন যুদ্ধের গর্জন, কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও আত্মিক স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ।
‘তিনি ছিলেন নারী অধিকার, মেহনতি মানুষের কল্যাণ আর অসাম্প্রদায়িক বিশ্বমানবতার এক অনন্য ফেরিওয়ালা। এই মহাকবি বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কৃতির চিরযৌবনের প্রতীক হয়ে আমাদের হৃদয়ে জাগরুক হয়ে আছেন এবং থাকবেন,’ যোগ করেন তিনি।
কবি নজরুলের জীবন এবং কর্ম জাতির জন্য প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কবি নজরুলের জীবন এবং কর্ম বিশ্বসাহিত্যের দরবারে আরও বেশি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তার জীবনবোধ ও জীবনদর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পৌঁছে দিতে হবে।’
এরই অংশ হিসেবে জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যায় কি না, সে ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান।
কবির বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালের দড়িরামপুরের নজরুল একাডেমি মাঠের নজরুল মঞ্চে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর এই তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানমালায় আরও রয়েছে নজরুল বইমেলা ও গ্রামীণ মেলা।
সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা, জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুর রহমান শিবলী, ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও খিলখিল কাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর, ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন এবং জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান।
অনুষ্ঠানে কবি নজরুল গবেষণা ও কবির জীবন-দর্শনে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ দুজন গুণীজনের হাতে ‘নজরুল পদক’ ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি ‘নজরুল স্মারকগ্রন্থ’ বা স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী অতিথি সারিতে বসে নজরুল ইসলামের স্মরণে আয়োজিত আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।


