দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৫২ হাজার ৩৭৫টি গাছ কাটার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে রাজশাহীতে, যেখানে এক বছরেই নিধন করা হয়েছে ২৩ হাজার ৪১টি গাছ।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) প্রকাশিত গাছনিধন মিডিয়া মনিটরিং ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
বৃহস্পতিবার পরিবেশ অধিদপ্তরের মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে গড়ে প্রতি মাসে ৪ হাজার ৩৬৫টি গাছ কাটা হয়েছে। রাজশাহীর পর সবচেয়ে বেশি বৃক্ষনিধনের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে, যেখানে কাটা হয়েছে ১১ হাজার গাছ। এ ছাড়া সুনামগঞ্জে ৬ হাজার ৪০৯টি এবং চট্টগ্রামে ৫ হাজার ১০৩টি গাছ কাটা হয়েছে। বিপরীতে মাগুরা ও মাদারীপুরে মাত্র একটি করে গাছ কাটার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আগের বছরের তুলনায় বৃক্ষনিধনের হার ব্যাপকভাবে কমেছে। গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪-২৫ সময়কালের তুলনায় গত এক বছরে গাছ কাটার ঘটনা ৭১ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারের সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্পের অনেকগুলো স্থগিত বা ধীরগতিতে চলায় গাছ কাটার চাপও কমেছে।
তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, গাছ কাটার হার কমলেও বন ও বৃক্ষসম্পদের ওপর চাপ এখনো উদ্বেগজনক। উন্নয়ন প্রকল্প, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং কাঠের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃক্ষআচ্ছাদন ও সবুজ এলাকা সংকুচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. লুৎফর রহমান বলেন, বন উজাড় ও বৃক্ষনিধনের কারণে মাটিক্ষয়, ভূমিধস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে গাছ কাটার খবর সামনে এলেও দেশে বন ও বৃক্ষনিধনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার মতো কোনো জাতীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। এ কারণে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।
বক্তারা বলেন, শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, রোপণ করা গাছের টিকে থাকা এবং সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতির কারণে বৃক্ষনিধন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বন আইন কার্যকর বাস্তবায়ন, নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্তি, টেকসই কৃষি বনায়ন সম্প্রসারণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোসহ ৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিবেশবিদদের ভাষ্য, এক বছরে বৃক্ষনিধনের হার কমে আসা ইতিবাচক সংকেত হলেও তা স্থায়ী সাফল্য নয়। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সবুজ আচ্ছাদন রক্ষার চ্যালেঞ্জ আরও গভীর হতে পারে।


