শহর যখন আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে, পুলিশ সদস্যরা তখনো তাদের দায়িত্বের জায়গায় অনড়। সারা রাত ডিউটি শেষ করে ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের আবার রাজপথে দেখা যায়। ঈদ, পূজা কিংবা পহেলা বৈশাখের মতো বড় উৎসবগুলোতে যেখানে সাধারণ মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে, সেখানে কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। এমনকি পরিবারের কারও মৃত্যু হলেও মাত্র এক বা দুদিনের ছুটি মেলে, যা আবার বছর শেষে তাদের বার্ষিক ছুটির হিসাব থেকেই কেটে নেওয়া হয়।
অস্বাস্থ্যকর ব্যারাক জীবন, অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া আর টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনিই এখন পুলিশ সদস্যদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রুক্ষ আচরণ আর রাজনৈতিক প্রভাবে পদোন্নতির অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ফলে বছরের পর বছর ধরে চরম মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের এক বিশাল অংশ।
প্রশ্নটা এখন আর কেবল তাদের কর্মদক্ষতা বা আচরণের ওপর সীমাবদ্ধ নেই; প্রশ্ন উঠেছে জবাবদিহিতার ওপর—নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে কে?
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইউম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পরিবার থেকে দূরে থাকা অনেক সদস্যকেই বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার মতে, প্রতিটি ইউনিট কমান্ডারের উচিত অধীনস্থদের মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখা এবং নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত বছর ১৯ জুন পটুয়াখালী পুলিশ ব্যারাক থেকে নারী কনস্টেবল তৃষা বিশ্বাসের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাত্র দুবছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই সদস্যের ঘরে একজন চিকিৎসকের চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে তার আত্মহত্যার প্রবণতার কথা উল্লেখ ছিল। চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিলেও তিনি তা করেননি এবং কাউকে নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানাননি। এর কয়েকদিন পর খুলনা রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাস নিজের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিশের দাবি, পারিবারিক কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত চারজন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১৩ এবং ২০২৪ সালে ছিল তিনজন। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও নেপথ্যের কারণগুলো একই—মানসিক অস্থিরতা, পরিবারের সান্নিধ্য না পাওয়া, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ এবং একাকীত্ব।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে প্রায় আড়াই লাখ সদস্য রয়েছেন, যার মধ্যে কনস্টেবলই প্রায় পৌনে দুই লাখ। অথচ বিশাল এই বাহিনীর জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল মাত্র একটি-রাজধানী ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও নেই কোনো স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ; আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কাজ চালানো হচ্ছে। সারা দেশের ৬৪টি জেলায় পুলিশের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থাকলেও কোনো হাসপাতালেই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ সামলানোর জন্য আমাদের কোনো কার্যকর পদ্ধতি বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। অপরাধ দমনের সময় যে কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারেন। সেই সময়ে তাদের মানসিক সুরক্ষা না দিলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।
এই সংকটের মূলে কী?
পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বঞ্চনার দীর্ঘ চিত্র ফুটে উঠেছে। কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার অধিকাংশ সদস্যকে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, এমনকি কখনো ১৮ ঘণ্টাও ডিউটি করতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি বলতে বাস্তবে কিছুই নেই। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনুযায়ী পুলিশ সদস্যরা সবসময় কর্তব্যরত বলে গণ্য হন, যা আইনিভাবেও তাদের বিশ্রামের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। উন্নত বিশ্বে যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের পর নিয়মিত কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক হলেও বাংলাদেশে এর কোনো বালাই নেই।
২০২০ সালে পুলিশ সদর দপ্তরের এক গবেষণাতেও এই সমস্যাগুলো উঠে এসেছিল। সেখানে স্বাস্থ্যকর খাবার, মানসম্মত আবাসন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম ভাতা, বিনোদন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রস্তাব ছিল ২৪ ঘণ্টাকে তিন শিফটে ভাগ করে ৮ ঘণ্টা করে ডিউটি করানোর। কিন্তু চার বছর পার হলেও মাঠ পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। উল্টো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অনেক সদস্যকে টানা ছয় মাস ছুটিহীন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
ডিএমপির গেণ্ডারিয়া থানায় কর্মরত একজন সদস্য জানান, ১৮ বছরের চাকরিজীবনে তিনি কখনোই পরিবারের সঙ্গে থেকে কাজ করতে পারেননি। তার মতে, পুলিশের ডিউটির শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
রমনা মডেল থানার আরেক সদস্যের দীর্ঘশ্বাস, ১৩ বছরের চাকরিতে তিনি কোনোদিন সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। বছরে এক-আধবার আবেদন করলে কপালে হয়তো ছুটি জোটে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদারও স্বীকার করেন, মানুষ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে, কিন্তু পুলিশ সদস্যরা ছুটির প্রয়োজনেও ছুটি পান না।
মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের অভিযোগ, বাহিনীর বিভিন্ন দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের কথাই সবসময় গুরুত্ব পায়। অথচ সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মূল ধাক্কাটা সামলান কনস্টেবল, এসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টররা। অস্বাস্থ্যকর ব্যারাকে থাকা আর নিম্নমানের খাবার খেয়ে অতিরিক্ত ডিউটি করলেও আনুপাতিক হারে সুযোগ-সুবিধা তারা পান না। এর ওপর যোগ হয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনস্টেবলের সহজ স্বীকারোক্তি, ছোট চাকরি, অল্প বেতন; কিন্তু পরিবারের চাহিদা অনেক। সেই চাপ সামলানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক সরদার নুরুল আমিন জানান, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে পুলিশ সদস্যরা শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যান্সারেও আক্রান্ত হচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর সুলতানা আলগিন পরামর্শ দেন, প্রতি ছয় মাস অন্তর পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। তার মতে, চব্বিশ ঘণ্টার ডিউটি যেখানে বাধ্যতামূলক, সেখানে বিষণ্ণতা আসা স্বাভাবিক। কাজের পরিবেশ ছাড়াও নৈতিক টানাপোড়েন অনেক সময় বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার মনে করেন, আত্মহত্যার সিদ্ধান্তটি হলো দীর্ঘ সংগ্রামের শেষ পর্যায়। এর আগে অনেক লক্ষণ দেখা যায়, যা সময়মতো শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ভাতা, আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ এবং আবাসন সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টরদের ওভারটাইম ভাতার বিষয়টি বিবেচনাধীন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের এই আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না মাঠের পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের সাইবার উইংয়ের একজন সাব-ইন্সপেক্টর বলেন, এমন প্রতিশ্রুতি প্রতিটি সরকারই দেয়। কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এবার আসলে কতটা কার্যকর হবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।


