আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের নতুন প্রশাসক জহির হোসেন।
সোমবার ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন। রোববার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেনকে এর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা পাওয়া এই কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের বর্তমান মূল অগ্রাধিকার হলো প্রতিষ্ঠানটিকে স্থিতিশীল করা, আমানতকারীদের আশ্বস্ত করা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, ব্যাংকের সব কার্যক্রম যেন স্বাভাবিকভাবে চলে তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জহির হোসেন জানান, একটি নতুন ও নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের সুপারিশ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করবে। তিনি আরও বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য, কারণ গ্রাহকরাই এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনের অধীনেই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পর্ষদের কাজ হলো নীতি নির্ধারণ করা এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আগের মতোই ব্যাংকটি পরিচালনা করবে বলে তিনি জানান।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ৯ জুনের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি তুলে নিয়েছেন। ১০ জুন আরও ৯০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী বুধ ও বৃহস্পতিবার প্রতি দিন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা করে তুলে নেওয়া হয়। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এই পরিস্থিতির পর ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চায়। এতে সাড়া দিয়ে রোববার ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরও আড়াই হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে ইসলামী ব্যাংক।
ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর টাকা তোলার চাপ কমতে শুরু করেছে। অনেক গ্রাহক যারা প্রথমে টাকা তোলার জন্য শাখায় এসেছিলেন, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কথা জানতে পেরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ফলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার আবেদন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, নগদ টাকার ঘাটতির কারণে যেসব সেবা ব্যাহত হচ্ছিল তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা হচ্ছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং মোবাইল ব্যাংকিং সহ সব ডিজিটাল ব্যাংকিং মাধ্যম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।
তবে যে সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে, তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের সাত দফা দাবি পুনর্ব্যাক্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। এর মধ্যে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবি রয়েছে।
ফোরামের নেতারা অভিযোগ করেন, পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ছিল একতরফা। এর ফলে কিছু গ্রাহকের আস্থা আরও কমতে পারে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ব্যাংক থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবিও জানান তারা।
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তি নিলামে তোলার দফায় দফায় ব্যর্থতা প্রসঙ্গে আলতাফ হোসেন বলেন, সম্পত্তিগুলো আকারে অত্যন্ত বড় হওয়ায় ক্রেতা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। অন্তত একটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আলাদা তদন্তের কারণে একটি সম্ভাব্য বিক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে গেছে। শেয়ারের মালিকানা বিতর্ক এবং সম্পদ উদ্ধার সংক্রান্ত চলমান আদালতের কার্যক্রম নিয়ে জহির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো বিচারিক প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হবে।


