ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় তিন হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার। সোমবার দুই দফায় ইসরায়েলের দুটি কারাগার থেকে এই বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে ১৫৪ জন বন্দীকে গাজায় ফিরিয়ে না দিয়ে ইসরায়েল থেকে বহিষ্কার করে মিশরে পাঠানো হয়েছে। মিশরের কর্মকর্তারা জানান, এই কারাবন্দীদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হবে।
দীর্ঘদিন কারাগারের অন্ধকূপে ধুঁকে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের একজন কামাল আবু শানাব (৫১)। তিনি বলেন, ‘এ এক বর্ণনাতীত কষ্টের যাত্রা ছিল। অনাহার, অন্যায় আচরণ, নির্যাতন, গালাগালি- ইসরায়েলে বন্দী একজন ফিলিস্তিনির সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা সম্ভব, তার সবই আমাদের সঙ্গে ঘটেছে।’
কামাল আবু শানাব জানান, ১৮ বছরের কারাবাসে তার ওজন কমেছে ৫৯ কেজি!
বেইতুনিয়ায় বাস থেকে নামতেই বন্দীদের কাঁধে তুলে নিয়ে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠেন ফিলিস্তিনিরা। বন্দীদের পরিয়ে দেওয়া হয় ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী ‘কেফিয়েহ স্কার্ফ’। বেশিরভাগ বন্দীর মুখেই উচ্ছ্বাসের হাসি, কেউ বুকে জড়িয়ে নেন প্রিয় মানুষকে। অনেকেই আবার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে চুপচাপ বসে পড়েন ক্লান্ত শরীরে। অনেকেই বন্দীদের ঘিরে আনন্দে ফাঁকা গুলি ছোড়েন আকাশে।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় কারাগার দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগের বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, দখলকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ইসরায়েলের মালিকানাধীন ‘ওফের’ কারাগার থেকে প্রথম ব্যাচে মুক্তি পান এক হাজার ৯৬৮ ফিলিস্তিনি কারাবন্দী। তারা সোমবার স্থানীয় সময় দুপরের দিকে রেডক্রসের কয়েকটি বাসে ওফের কারাগার থেকে পশ্চিম তীরের বেইতুনিয়া শহরে পৌঁছান।
প্রায় একই সময়ে দক্ষিণ ইসরায়েলের নাগেভ কারাগার থেকে গাজার দক্ষিণ সীমান্তের খান ইউনিস শহরে পৌঁছান মুক্তিপ্রাপ্ত এক হাজার ৭১৮ ফিলিস্তিনি কারাবন্দী। তাদের ২৫০ জনই ইসরায়েলে হত্যা ও জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন।
বার্তা সংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, বছরের পর বছর ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে তাদের পরিবার। বন্দীদের নিয়ে রেড ক্রসের বাস গাজায় ঢুকতেই গোটা গাজা ও পশ্চিম তীরজুড়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে ফিলিস্তিনিরা। গাজা উপত্যকার খান ইউনিস ও পশ্চিম তীরের বেইতুনিয়ায় হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে বন্দীদের স্বাগত জানান।
রেড ক্রসের গাড়িতে করে কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া বন্দীরা ‘বিজয়ের চিহ্ন’ (ভি-সাইন) দেখিয়ে উল্লাসরতদের উদ্দেশে হাত নাড়েন।

পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের মুক্তি উপলক্ষে ইসরায়েলি সতর্কতা উপেক্ষা করেই বহু মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ওফার কারাগারের সামনের একটি পাহাড়ে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ছত্রভঙ্গ করতে ইসরায়েলি বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে। মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের প্রথমে হাসপাতালে নেওয়া হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। এরপর তারা ফিরে যান নিজ নিজ পরিবারের কাছে।
মুক্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছে একাধিক আলোচিত নাম। রায়েদ শেখ, ৫১ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি ২০০০ সালে দুই ইসরায়েলি সেনা হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন দণ্ড পান। মাহমুদ ইসা, ৫৭ বছর বয়সী হামাস কমান্ডার, যিনি ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত। ইয়াদ ফাতাফতা, যিনি এক মার্কিন পর্যটককে হত্যা ও অপর এক নারীকে আহত করার দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত।
তবে হামাসের দাবিকৃত তালিকায় কিছু শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নাম থাকলেও তাদের মুক্তি দেয়নি ইসরায়েল। ওই বন্দীদের মধ্যে আছেন মারওয়ান বারঘুতি, হাসান সালামেহ, আহমেদ সাদাত ও আব্বাস আল-সাইয়েদ। মারওয়ান বারঘুতিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়।


