সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ইরানের সরকার ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার নতুন হুঁশিয়ারিতে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি গুলি চালানো শুরু কর, আমরা তখন গুলি চালানো শুরু করব।’
‘আমি শুধু আশা করি ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে, কারণ এখন জায়গাটা খুবই বিপজ্জনক’, যোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানের ক্রাউন প্রিন্স ও মোহাম্মদ শাহ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভির সঙ্গে যেকোনো বৈঠকের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যে ইরান সরকারের বিরোধী কোনো নেতার সঙ্গে বৈঠকের আগে ট্রাম্প ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইবেন।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইরানে বিক্ষোভ দমন চেষ্টায় সাধারণ জনগণ নিহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির নেতারা। শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার নিন্দা জানিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক বলেন, ইরানে প্রাণহানিতে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার আছে, এবং সেই অধিকার রক্ষা করা ও তা সম্মান নিশ্চিত করা ওই দেশের সরকারের দায়িত্ব।’

গত বৃহস্পতিবার ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির ডাকে তেহরানসহ বড় শহর ও গ্রামে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নামেন লাখো ইরানি জনগণ। শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চলা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার।
ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কেবল সীমিত ও অনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়। সরকারের এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুক্রবার রাতেও তীব্র জনমত গড়ে তোলেন দেশটির সাধারণ জনগণ।
ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানায়, ‘দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে’ ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।
স্থানীয় অধিকার সংগঠনগুলোর বরাতে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য প্রচার করে জানায়, রাতভর সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরানি অধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ শুক্রবার জানায়, ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৬২ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪৮ জন বিক্ষোভকারী।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পিছু না হটার অঙ্গীকার করেন। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘বিদেশের বিরোধী গোষ্ঠী’ ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করার অভিযোগ তোলেন তিনি।
খামেনি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র শত সহস্র সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমরা বিক্ষোভকারীদের সামনে পিছু হটব না।’
এ ছাড়া বিক্ষোভ উস্কে দেওয়াসহ দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেন পাবলিক প্রসিকিউটর।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিক্ষোভ গত তিন বছরের মধ্যে ইরানের ধর্মীয় শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা এবং গত বছরের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরানে অস্থিরতা ক্রমেই বেড়েছে।
প্রাথমিকভাবে ভঙ্গুর অর্থনীতি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিলেও, গত বছর ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য অর্ধেকে নেমে যাওয়া এবং ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সরাসরি সরকারকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভে রূপ নেয়।
গত সপ্তাহে ইরানের সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষভকারীদের প্রতি ‘সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি’ নজায় রাখতে নিরাপত্তারক্ষীদের আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে বর্ধিত মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় সরকার সীমিত আর্থিক প্রণোদনাও ঘোষণা করে।
এদিকে নির্বাসিত নেতা পাহলভি জানান, তার ডাকে ইরানিরা কেমন সাড়া দেয় তার ওপর ভিত্তি করে তিনি পরবর্তী পরিকল্পনা দেবেন। কারণ অতীতে ইসরায়েলের প্রতি পাহলভির সমর্থন এবং পাল্টা সমর্থন ও সুসম্পর্ক দেশের কট্টর ইসলাম্পন্থিদের মধ্যে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে।
রেজা পাহলাভির বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরানের শেষ রাজা ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। মারাত্মকভাবে অসুস্থ অবস্থায় তিনি পরিবারসহ ইরান থেকে বিতাড়িত হন।
এরপর থেকে ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলাভির পক্ষপাতিত্ব ইরানে করাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি পাহলভির পক্ষে কেউ প্রকাশ্যে স্লোগান দিলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দেয় ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতা নেওয়া সরকার।


