ইবিএল চেয়ারম্যানকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন

ইবিএল চেয়ারম্যানকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) চেয়ারম্যানকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক ও কাস্টমস নথি এবং বিদেশি সরকারি দলিল বিশ্লেষণে ব্যাংকটিতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং বিদেশে অর্থপাচারে সংযোগের তথ্য সামনে এসেছে। এগুলো ইবিএলের মতো একটি বড় ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তদারকি ও সুশাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

টাইমস অব বাংলাদেশের পর্যালোচিত নথিপত্রে দেখা যায়, ইবিএলের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে শিল্প ঋণের নামে শুল্কমুক্ত সুবিধায় একটি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ কৃত্রিমভাবে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো এবং ইবিএলের খেলাপি ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামির বিদেশের ঠিকানা চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের তথ্যও উঠে এসেছে।

ব্যাংক রেকর্ড, ঋণ শ্রেণিকরণ সংক্রান্ত তথ্য, কাস্টমস নথি এবং বিদেশি ভূমি নিবন্ধন দলিল থেকে পাওয়া এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয়–এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়; বরং ব্যাংকিং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

নথি অনুযায়ী, ইবিএল ২০১৬ সালে তাদের গ্রাহক ও শীর্ষ ঋণখেলাপি নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যার লিমিটেডের নামে একটি ‘শিল্প ঋণ’ অনুমোদন দেয়। ওই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্টে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে একটি নতুন মার্সিডিজ-বেঞ্জ এএমজি জি–৬৩ আমদানি করা হয়।

আমদানির বিল অব এন্ট্রিতে এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যার লিমিটেডের নাম ‘আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। তবে নথি ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, গাড়িটি কখনোই কোনো শিল্প বা উৎপাদনমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়নি।

সিইপিজেডের বন্ড তদারকির সঙ্গে যুক্ত দুই সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার টাইমসকে জানান, আমদানির শুরু থেকেই গাড়িটি ইবিএল চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের ছেলে জারান আলী চৌধুরী নিয়মিত গাড়িটি ব্যবহার করতেন।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বন্ড সুবিধায় আনা ওই গাড়িটি ২০২০ সাল পর্যন্ত ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করে চলাচল করেছে। এর মাধ্যমে মূলত নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা ও শুল্ক এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাড়িটির ছবি ও তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে এটি আমদানিকারক কোম্পানির নামে নিবন্ধন করা হয়। বন্ড বিধি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের নিবন্ধন বন্ড আইনের মূল শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, ওই আইনে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানিকৃত গাড়ি কেবল কারখানার কার্যক্রমেই ব্যবহার করা যায়।

গাড়িটি ঘিরে চলা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তের সময়কালও মিলে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ সুবিধা দিতেই তাদের ঋণ খেলাপি দেখানো হয়নি। নথি অনুযায়ী, নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান মাল্টি সাফ ব্যাগস লিমিটেডের কাছে ইবিএলের পাওনা প্রায় ৯৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই ঋণটি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও রেকর্ডে দেখা যায়, কৃত্রিমভাবে এটিকে ‘নিয়মিত’ রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের চর্চা ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদমান আড়াল করে এবং আমানতকারীদের অর্থকে সরাসরি বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে।

ইবিএল থেকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নাজমুল আবেদীন মানি লন্ডারিং ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং কাস্টমস কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার একজন আসামি। সরকারি নথিতে তার বিরুদ্ধে প্রায় ২২২ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এর পরও নাজমুল আবেদিনের ব্যাংকিং সুবিধা অব্যাহত থাকায় ইস্টার্ন ব্যাংকের ভেতরে স্বার্থের সংঘাত ও সুশাসনের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।

নথির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনিয়মের বিস্তৃতি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আলোচ্য ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনুসরণ করলে আরও বিস্তৃত অনিয়মের চিত্র সামনে আসে। সেখানে ঋণগুলো নিয়ে ইবিএলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মালিকানার কাঠামো, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে অর্থপাচারের যোগসূত্র পাওয়া যায়।

করপোরেট রেকর্ডে দেখা যায়, ৯৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠান মাল্টি সাফ লিমিটেডের শেয়ারধারকদের তালিকায় শওকত আলী চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতি ছিল। তার বাল্যবন্ধু হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাজওয়ার ফিরোজ হক বিভিন্ন সময়ে মাল্টি সাফের শেয়ারধারী ছিলেন। এ ছাড়া, তাজওয়ার ফিরোজ হকের স্ত্রী ফারাহনাজ হক ছিলেন মাল্টি সাফের একজন প্রতিষ্ঠাকালীন শেয়ারহোল্ডার।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাসহ অনুসন্ধানী সূত্রগুলোর দাবি, ফারাহনাজ হকের শেয়ারহোল্ডিং মূলত একটি ‘আবরণ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেয়ারহোল্ডিং পরিবর্তনের ধরন, কোম্পানিতে শেয়ারধারীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়কাল এবং কোম্পানির কার্যক্রমে ইবিএল চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে মাল্টি সাফের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল ইবিএল চেয়ারম্যানের হাতে।

বিদেশি নথি পর্যালোচনায় গেলে বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়। নাজমুল আবেদীন নিজেকে একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে দেখিয়ে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছেন। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে দুদকের তদন্তকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন—নাজমুল আবেদীন ইবিএল চেয়ারম্যানের ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন কি না এবং তার মাধ্যমে শওকত বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন কি না।

এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয় সিঙ্গাপুর ল্যান্ড অথরিটির (এসএলএ) নথি পর্যালোচনায়। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারিন পাচারের টাকায় সিঙ্গাপুরে সম্পদ কিনতে যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন, একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন মুজিবুর রহমান মিলন–যিনি মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে দণ্ডিত। মিলন অগ্রণী ব্যাংকের দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি এবং ইবিএলের একজন ঋণখেলাপি।

সিঙ্গাপুরের আলোচ্য ঠিকানাটি হলো ১২০ লোয়ার ডেল্টা রোড, ১১-০৯, সেনডেক্স সেন্টার।

টাইমসের অনুসন্ধানে আরও পাওয়া গেছে, শওকত আলী চৌধুরী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত একাধিক অফশোর প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিপুল অর্থ পাচার করেছেন। এই অর্থ পাচারের কাজে তিনি ব্রিটিশ শাসিত দ্বীপরাষ্ট্রটিতে খোলা কয়েকটি শেল কোম্পানি ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক শিপ ব্রোকার মুজিবুর রহমান মিলন এসব শেল কোম্পানি খুলতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। মিলন ও শওকতের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্রও বিষয়টি এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের ব্যাংকের একজন পলাতক ঋণখেলাপির অফিস বা ঠিকানা ব্যবহার করা একজন দায়িত্বশীল ব্যাংক চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। তাদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং অবৈধ আর্থিক প্রবাহে সম্ভাব্য যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়।

এসিকে ইবিএলে নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শওকত আলী চৌধুরী, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক ও ঋণ হিসাবের তথ্য চাওয়ার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও ইস্টার্ন ব্যাংক সেই তথ্য সরবরাহ করেনি বলে দুদক সূত্র দাবি করেছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে বন্ড সুবিধার আওতায় আনা বিলাসবহুল গাড়িটি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালের ২৩ মার্চ জব্দ করেছে। বর্তমানে গাড়িটি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তত্ত্বাবধানে সিইপিজেড এলাকার একটি গ্যারেজে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি নিলাম করার কথা থাকলেও এখনো নিলাম করা হয়নি।

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত সকল অভিযোগ ও অনুসন্ধানী তথ্য নিয়ে মন্তব্যের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সংবাদটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad