ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ ‘ওমেগা ব্লক’: ফ্রান্সে শিশুসহ ১৮ জনের মৃত্যু

ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ ‘ওমেগা ব্লক’: ফ্রান্সে শিশুসহ ১৮ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের চারপাশে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তীব্র গরমে থামিয়ে রাখা গাড়িতে থাকা দুই শিশুও রয়েছে।

সোমবার ইউরোপের বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ডের পর অনেক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে ফ্রান্সের সরকার। তুলনামূলক কম তাপমাত্রার শহরগুলোতেও ক্লাসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেনের আবহাওয়া পূর্বাভাসকারীরা সতর্ক করেছেন, চলতি সপ্তাহে দেশটিতে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।

ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলের বিখ্যাত ভাইন ইয়ার্ড (আঙুরখেত) বোর্দোতে সোমবার তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এই তাপমাত্রা গত বছরের আগস্টে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। মধ্য ফ্রান্সের পোয়াতিয়ে শহরে এদিন তাপমাত্রা ওঠে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৯৪৭ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কারপন্ত্রা শহরের এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, সোমবার দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুকে তাদের মা বাড়ির বাইরে পারিবারিক গাড়ির ভেতর অচেতন অবস্থায় খুঁজে পান। পরে উদ্ধারকর্মীরা তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। তাদের মা জানান, শিশুদের গাড়ির ভেতরে রেখে তিনি কাজে গিয়েছিলেন। ইঞ্জিন বন্ধ থাকায় তীব্র গরমে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।

বোর্দো অঞ্চলে রোববার তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্য জটিলতায় ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিন প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা সোফি ব্রোকা। এ ছাড়া রোববার থেকে সোমবারের মধ্যে অন্তত ১৩ জন তীব্র গরমে পানিতে নেমে গোসল করার সময় ডুবে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এর পর ফরাসি বেসামরিক নিরাপত্তা বিভাগের মুখপাত্র জেরোম বুলঁজে জনগণকে সতর্ক করে বলেন, ‘কেবল প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান থাকা স্থানেই সাঁতার কাটুন।’

গতবছরও তাপপ্রবাহের সময় ফ্রান্সে মানুষ শরীর ঠান্ডা করতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ১৭২ শতাংশ বেড়েছিল।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে পারদ ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ।

তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে পানিতে লাফিয়ে পড়ছেন ফ্রান্সের স্থানীয়রা। ছবি: এপি/ইউএনবি

ইউরোপের দেশ স্পেনের তুলনামূলক শীতল উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান সেবাস্তিয়ানেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি ২২ জুনের ঐতিহাসিক গড় তাপমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি। জলবায়ু পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিশ্বের অন্য যে কোনো মহাদেশের তুলনায় ইউরোপ তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে সবচেয়ে বেশি বিচ্যুত ছিল।

আরও পড়ুন

স্পেনের আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র রুবেন দেল কাম্পো বলেন, ‘আমরা বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখছি। উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় এই পার্থক্য ১০ ডিগ্রিরও বেশি।’

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এপ্রিল মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আঘাত হানা বর্তমান তাপপ্রবাহকে ‘ওমেগা ব্লক’ বলা হচ্ছে। কারণ বায়ুমণ্ডলে এর গঠন গ্রিক বর্ণমালার ওমেগা অক্ষরের মতো। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, মাঝখানে উষ্ণ বায়ুর একটি বড় অংশ এবং দুই পাশে তুলনামূলক শীতল বায়ুর উপস্থিতির কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, ‘এটি উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে উষ্ণ বায়ু টেনে আনছে। এ কারণেই আমরা এত তীব্র তাপ অনুভব করছি। এটি খুব ধীরগতিতে সরে যাচ্ছে, ফলে বাতাসও প্রায় নেই, যা সামান্য স্বস্তিও দিচ্ছে না।’

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় উভয়ই আরও তীব্র হচ্ছে, যার ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বৃষ্টিও বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

ব্রিটেনের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, দেশটিতে চার দিনের তাপপ্রবাহে কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালে রেকর্ড হওয়া জুন মাসের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহজেই ভেঙে যাবে। কয়েক সপ্তাহ আগেই দেশটি মে মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছিল।

লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে হাঁটতে বের হওয়া তথ্যবিজ্ঞানী লুইস জেনিংস বলেন, ‘৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রাই অসহনীয় হতে যাচ্ছে। এটি দেহে ৪০ ডিগ্রির মতো অনুভব দিচ্ছে।’

ইতালিও সোমবার ১২টি শহরে সর্বোচ্চ মাত্রার তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি করেছে।

তুরিন শহরে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ পড়ায় বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইরেন কর্মীদের অতিরিক্ত শিফট চালু করেছে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র যুক্ত করছে বলে এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।

বেলজিয়ামের তেম্পলু শহরে অবস্থিত বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা রোমেন দ্য জাগেরে জানান, অস্বাভাবিক গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছাদ ও কার্নিশের নিচে বাসা বাঁধা পাখিরা। এর মধ্যে রয়েছে আবাবিল, চড়ুই ও শালিক।

তিনি বলেন, ‘ছাদের ওপর তাপমাত্রা কখনো কখনো ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে অনেক পাখি বাসার ভেতরে পুড়ে মরার বদলে নিচে লাফিয়ে পড়তে বাধ্য হয়।’

তিনি জানান, গত তিন দিনে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে আহত অবস্থায় ১৫০টি প্রাণী আনা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad