ঢাকার বাড্ডার মতো ব্যস্ত এলাকার একটি দোকান। ব্যবহৃত ল্যাপটপ বিক্রি করে এই দোকানটিই দেড় বছরে ভাগ্য বদলে দিয়েছে মুকতারের। মাসে ৪০–৫০টি ল্যাপটপ বিক্রি করে গড়ে তার আয় প্রায় আট লাখ টাকা।
বিশ্বের নানা নামি ব্র্যান্ডের পুরোনো ল্যাপটপগুলো সাজিয়ে রাখা ঝকঝকে দোকানে বসে কথা হয় মুকতারের সঙ্গে। ক্রেতাও নেহাত কম নয়। টাইমস অব বাংলাদেশকে মুকতার বলেন, ‘এসব ল্যাপটপের বেশিরভাগই আসে বিদেশে থেকে। বিশেষ করে দুবাই থেকে।’
যদিও বাংলাদেশ আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২০২৪–এর অধীনে ব্যবহৃত কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ আমদানি নিষিদ্ধ। তারপরও গত পাঁচ বছরে দেশের বাজারে ক্রমেই বাড়ছে বিদেশি ব্যবহৃত ল্যাপটপের সংখ্যা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন দেশের অর্ধেকের বেশি ল্যাপটপ–ক্রেতাই ঝুঁকছেন ব্যবহৃত পণ্যের দিকে। কারণ নতুন ল্যাপটপের দাম অনেক বাড়তি। সেখানে ব্যবহৃত এসব ল্যাপটপ পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেক দামে।
মুকতারের মুখেও শোনা গেল তেমন কথাই। তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে ভরসা আরও বাড়ছে। ব্যবহৃত হলেও বেশির ভাগ ডিভাইস ভালো থাকে। তাছাড়া রিপ্লেসমেন্ট ও সার্ভিস ওয়ারেন্টিও থাকছে।’
যদিও ল্যাপটপগুলো কীভাবে দেশে ঢোকে—এমন প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে বিদেশ থেকে এসব বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। তাদের কাছ থেকেই কিনি।
সামাজিক মাধ্যমেও এখন বিদেশি ব্যবহৃত ল্যাপটপের বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি।
কম্পিউটার খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠার স্টার টেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান রাশেদ আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘পাঁচ বছর থেকেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে গত দুই–তিন বছরে বাজারে ব্যবহৃত আর নন–চ্যানেল ডিভাইস অনেক বেড়েছে।’
যদিও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহৃত ল্যাপটপ এভাবে বাজার দখল করে ফেলায় সরকার হারাচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব। আর বৈধভাবে নতুন ল্যাপটপ আমদানিকারকরা হারাচ্ছেন ক্রেতা।
মহামারীর প্রভাব
বিদেশ থেকে আনা ব্যবহৃত ল্যাপটপের বাজার বাড়তে শুরু করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে। হোম অফিস ও অনলাইন ক্লাসের কারণে ওই সময়ের বাড়তি চাহিদায় নতুন ল্যাপটপের সংকট দেখা দেয়। ২০২০–২৩ সালে বৈশ্বিক চিপ সংকটে বেড়ে যায় নতুন ল্যাপটপের দাম। দেশে সেই দামের আগুন আরও উস্কে দেয় ডলারের দাম এবং ভ্যাট বৃদ্ধি।
ফলে অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় নতুন ল্যাপটপ কেনা। বর্তমানে ল্যাপটপ আমদানিতে তিন বছর আগের তুলনায় ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়তি ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। এই সময়ে ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে। তাতে করে সব ধরনের আমদানি পণ্যেরই দাম বেড়ে গেছে।
রাশেদ বলেন, সে কারণে আগে যে ল্যাপটপ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো এখন তা বিকোচ্ছে ৬০ হাজার টাকায়।
ক্রেতা সেজে ব্যবহৃত ল্যাপটপের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, স্পেসিফিকেশন, ব্র্যান্ড ও অবস্থা অনুযায়ী ল্যাপটপের দাম ওঠানামা করছে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি কিছু দোকানে মিনি কম্পিউটারও বিক্রি হচ্ছে, যেগুলোর দাম সাত হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
যদিও সর্বশেষ মডেলের ল্যাপটপ ও মিনি কম্পিউটারের দাম তুলনামূলক বেশি, তারপরও তা অফিসিয়াল আমদানিকারক দোকানগুলোর থেকে এখনো সস্তা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যবহৃত কোর আই ফাইভ এইট জেনারেশনের এইচপি ল্যাপটপের কথা, যেটার দাম পড়বে প্রায় ২২ হাজার টাকা আর আর ব্র্যান্ড–নিউ কোর আই ফাইভ ১৩তম জেনারেশনের ল্যাপটপ নামি দোকানে নিতে দিতে হবে ৭০ হাজার টাকার বেশি।
মিরপুর–১০-এর ব্যবহৃত ল্যাপটপ বিক্রেতা রাজিব হাসান বলেন, ‘এসব কেনার ক্ষেত্রে জেনারেশনে ছাড় দিলে অন্তত এক–তৃতীয়াংশ টাকা বেঁচে যায়। যে টাকাটা পরে দরকার হলে সার্ভিস বা রিপেয়ারে কাজে লাগবে।’ তাছাড়া বেশিরভাগ বিক্রেতাই এক মাস পর্যন্ত এক্সচেঞ্জ গ্যারান্টি ও ২–৩ বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টির আশ্বাস দেন।

বিসিএস কম্পিউটার সিটি। ছবি: উইকি
ব্যবহৃত ল্যাপটপের ঘাঁটি
রাজধানীতে ব্যবহৃত ল্যাপটপের দুই বড় কেন্দ্র—এলিফ্যান্ট রোড ও মিরপুর–১০।
এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারেই ব্যবহৃত ল্যাপটপের প্রায় ১০০টি দোকান, আশপাশে আরও ৩০টির মতো। মিরপুর–১০-এর শাহ আলী মার্কেট ও এফএস স্কয়ারে রয়েছে প্রায় ১৯টি দোকান।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ আরও কয়েকটি শহরেও ব্যবহৃত ল্যাপটপের বিশেষায়িত দোকান রয়েছে।
মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের কম্পিউটার ব্যবসায়ী কবির বলেন, ‘আমার ধারণা দেশের ৭০ শতাংশ ল্যাপটপই এখন বিদেশি ব্যবহৃত।’
তিনি যোগ করেন, ‘এই সপ্তাহে একটা ডেস্কটপও বিক্রি হয়নি। শুধু আমার না, অনেক দোকানেই এমন চিত্র।’
নতুন ল্যাপটপের বাজার সঙ্কুচিত
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি মাসে ২০ হাজার নতুন ল্যাপটপ ও ২০ হাজার ডেস্কটপ বিক্রি হয়।’
বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, যদি প্রতিটি কম্পিউটারের দর গড়ে ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে বছরে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।
জহিরুল বলেন, ‘আগে নতুন ল্যাপটপের চাহিদা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু ব্যবহৃতগুলো দেশে আসা বাড়ায় তা কমে গেছে।’
বিসিএসের মহাসচিব মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামও বলেন, বাজারের বড় অংশ এখন ব্যবহৃত ডিভাইসের দখলে।
যদিও এ বিষয়ে কোনো অফিশিয়াল তথ্য নেই, তবে দোকানমালিকদের কথার ভিত্তিতে টাইমস অব বাংলাদেশের হিসাব বলছে, মাসে প্রায় ৩০ হাজার ব্যবহৃত ল্যাপটপ বিক্রি হয়, যার মূল্য প্রায় দেড়শ কোটি টাকা।

আইনের ফাঁক গলে আমদানি
অংশীজনদের মতে, আইনের ফাঁক ব্যবহার করেই দেশে ঢুকছে এসব ল্যাপটপ।
মাসে প্রায় ২০০ ল্যাপটপ আনে এমন একটি দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশ থেকে দেশে ফিরলে সঙ্গে দুটি ল্যাপটপ ও দুটি মোবাইল আনার অনুমতি আছে।
তিনি বলেন, ‘অনেকেই একটি মোবাইল ব্যবহার করেন, ফলে বৈধভাবেই দুটি ল্যাপটপ ও একটি মোবাইল আনতে পারেন তিনি। আমরা সাধারণত আগেই যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কেউ অর্থের বিনিময়ে আমাদের জন্য ফোন ও ল্যাপটপ আনতে রাজি হলে আমাদের লোক বিমানবন্দরে গিয়ে অপেক্ষা করে। তারা পৌঁছালেই সেসব নিয়ে আসে।’
তিনি যোগ করেন, ‘একটি ল্যাপটপ এনে দিলে ৪ হাজার আর মোবাইল এনে দিলে ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এতে যাত্রীর খরচও কিছুটা উঠে যায়।’
পরিবেশগত বিপদের শঙ্কা
এসব ডিভাইসের বদৌলতে গ্রাহকরা তাদের টাকা বাঁচাতে পারলেও দেশের ই–বর্জ্যের (ইলেকট্রনিক বর্জ্য) বোঝা বাড়াচ্ছে এসব ল্যাপটপ।
দেশে আসা এসব ডিভাইসের অনেকগুলোই জীবনচক্রের শেষ প্রান্তে। বহু দেশে এগুলো বিবেচনা করা হয় ই–বর্জ্য হিসেবে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, ‘এসব বর্জ্য ঠিকমতো অপসারণ করা না হলে তা ক্যান্সারসহ নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।’
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) বলছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই দশমিক সাত মিলিয়ন টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়।


