বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। বুধবার থেকে অভূতপূর্ব এই আইনটি কার্যকর করেছে দেশটির সরকার। অনলাইনে শিশুর নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে এই আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবক, শিশু অধিকারকর্মী ও সাধারণ জনগণ। তবে প্রযুক্তি কোম্পানি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা অনেক অধিকারকর্মীর মতে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাত ১২টা বাজতেই এক্স, টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ ১০টি বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেয় অস্ট্রেলিয়ান সরকার।
এই আইন অমান্য করলে প্রতিটি কোম্পানিকে সর্বোচ্চ চার কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে।
দেশটিতে গত এক বছরে শিশুদের উপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গবেষণায় উঠে আসে, ৮ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৮৬ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ান শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতো।
অতিরিক্ত অনলাইন ব্যবহার কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভুল তথ্য, সাইবারবুলিং, অনুমতি ছাড়া ছবির ভুল ব্যবহার নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়। নাবালকদের এসব ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতেই সরকার এ কঠোর আইন প্রণয়ন করে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এই দিনকে ‘ঐতিহাসিক’ ও পরিবারগুলোর জন্য ‘গর্বের দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। অনলাইনে শিশুদের প্রতি হিংসা ও অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা ঠেকাতে নীতিনির্ধারকরা যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন, এটি তার একটি বড় প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ বলেন, ‘এটি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। এই সংস্কার অস্ট্রেলিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্য দেশেও প্রভাব ফেলবে।’
সামাজিক মাধ্যম বন্ধের আগে শিশুদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মোবাইলের পরিবর্তে খেলাধুলায় মনোযোগ দিতে, নতুন কোনো বাদ্যযন্ত্র শিখতে বা অনেকদিন ধরে পড়ার অপেক্ষায় থাকা বই হাতে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
সামাজিক মাধ্যম ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার আগে দেশটির প্রায় এক মিলিয়ন শিশু ব্যবহারকারী শেষবারের মতো তাদের অনলাইন বন্ধুদের বিদায় জানাতে শুরু করে।
কেউ লিখেছে, ‘আর কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নয়… আর দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ নয়।’ কেউ বা হাস্যরসের সঙ্গে লিখেছে, ‘#seeyouwhenim16’ অর্থাৎ ১৬ বছর হলে আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।
অস্ট্রেলিয়ান সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো প্ল্যাটফর্ম এলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনটির আওতায় চলে আসবে। ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের জন্য আচরণভিত্তিক বয়স অনুমান, সেলফির মাধ্যমে বয়স নির্ধারণ, এমনকি পরিচয়পত্র বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিংকের মতো কঠোর পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শও দিয়েছে নীতিনির্ধারকরা।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ। অস্ট্রেলিয়া সফল হলে এবং প্রয়োজন মনে করলে তারাও এ ধরনের আইন বিবেচনায় আনবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্কিন-অস্ট্রেলিয়ান দ্বৈত নাগরিক ও ই-সেফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের পদক্ষেপ চেয়ে অনেক অভিভাবক তাদের কাছে আবেদন করছেন। তিনি বলেন, ‘মার্কিন পরিবারগুলো প্রায়ই বলে- আমাদের দেশেও যদি তোমাদের মতো একটি ই-সেফটি কমিশনার থাকত! আমরা চাই সরকার যেন কিশোরদের নিরাপত্তাকে প্রযুক্তি কোম্পানির লাভের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।’
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার এই আইনকে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী’ বলে মনে করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ফেসবুক, টিকটক, ইন্সটাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো এক পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ান ই-সেফটি কমিশনারের যুক্তি মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে আইনটি কার্যকরে সহায়তা করতে রাজি হলেও বিশ্ব ধনকুবের ইলন মাস্কের প্ল্যাটফর্ম এক্স তাতে গড়িমসি করে।
তারা জানায়, এ ধরনের আইন মানতে তারা বাধ্য নন। কোম্পানি পলিসিতেও এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবুও অস্ট্রেলিয়ায় আইন পাশ করে মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট ও তথ্য মুছে ফেলতে তাদের বাধ্য করছে। এক্স কর্তৃপক্ষ এক বার্তায় জানিয়েছে, ১৬ বছরের নিচে কোনো ব্যবহারকারী এই প্ল্যাটফর্মে থাকলে তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হবে।


