ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধ সত্ত্বেও আরও তিন থেকে চার মাস তেহরান টিকে থাকতে সক্ষম বলে জানিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই মাসের বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার পরেও ইরানের কাছে অবরোধ মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত মজুদ আছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টা শুক্রবার অনেকটাই থমকে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি তেলবাহী জাহাজ প্রবেশকে কেন্দ্র করে এদিন উপসাগরীয় অঞ্চলে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিআইএ-এর এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবরোধ আরোপের পরও অন্তত আরও চার মাস তেহরান তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে না।
অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা এখনো সীমিত। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, আইনপ্রণেতা এমনকি ট্রাম্পের দলীয় প্রতিনিধিরাও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করার বিষয়ে বিরোধিতা করছেন। পাশপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যেও এই যুদ্ধ ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এ গোয়েন্দা মূল্যায়নের খবর প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ওই সিআইএ বিশ্লেষণে প্রকাশিত দাবিগুলোকে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষায়, ‘এই অবরোধ ইরানে “বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান ক্ষতি” করছে। এর ফলে বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে।’
এদিকে প্রায় এক মাস আগে ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের সমুদ্র অঞ্চলে সংঘাত থামেনি। শুক্রবার দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলাকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। এদিন মার্কিন বাহিনীর হামলার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম বড় জ্বালানি কেন্দ্র সংলগ্ন বন্দরে পাল্টা হামলা চালায় ইরানের সামরিক বাহিনী। ওই বন্দরের কাছেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর নৌঘাঁটির অবস্থান।
ইরানের একটি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় একজন নাবিক নিহত, ১০ জন আহত এবং আরও চারজন নিখোঁজ হয়েছেন।
অন্যদিকে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন প্রস্তাবে ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। ওই প্রস্তাবে প্রথমে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিতর্কিত ইস্যুতে আলোচনা চালানোর কথা বলা হয়েছে।
রোমে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আজই আমরা কিছু জানতে পারি। আমরা তাদের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান এখনো তাদের জবাব নিয়ে পর্যালোচনা করছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে চীন ও হংকংভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তারা ইরানের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কাঁচামাল সরবরাহে সহায়তা করছে।
ট্রেজারি বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান যেন সামরিক শিল্পভিত্তি যাতে পুনর্গঠন করতে না পারে এবং বিদেশে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
এছাড়া ইরানের ‘অবৈধ বাণিজ্যে’ সহায়তাকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রয়োজনে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও দ্বিতীয় দফার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
অবশ্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এমন সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি তার বেইজিং সফরকেও প্রভাবিত করতে পারে শঙ্কা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।


