দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্রে বাংলাদেশ বরাবরই একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা তথা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সূচক এবং বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে থাকা অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে এ দেশ বৈশ্বিক রাজনীতিতে কখনোই উপেক্ষিত ছিল না।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, সুশাসনের চরম অভাব এবং ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের কারণে রাষ্ট্রের প্রকৃত সম্ভাবনাকে বৈশ্বিক দরবারে সঠিকভাবে মেলে ধরা সম্ভব হয়নি।
একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান যদি তার জন্য আশীর্বাদ হয়, তবে দুর্বল ও নতজানু নেতৃত্ব সেই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির হাতিয়ার না বানিয়ে উল্টো পরনির্ভরশীলতার ফাঁদে পরিণত করে। বিগত দিনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং জনগণের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যে অভূতপূর্ব মর্যাদা অর্জন করছে, তা মূলত এক দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জনমুখী কূটনৈতিক কৌশলেরই ফসল।
কূটনৈতিক সাফল্যের গভীরতা অনুধাবন করতে হলে আমাদের অতীতের আত্মঘাতী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কৌশলের দিকে তাকাতে হবে, যা দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের বিপুল সম্ভাবনাকে অবদমিত করে রেখেছিল। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের মূল চরিত্রই ছিল—অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের অধিকার হরণ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নতজানু নীতি গ্রহণ করা। শুধুমাত্র অন্যায্য উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দুর্বল করা হয়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশকে এক প্রকার পরনির্ভরশীল ও করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করার এক হীন প্রবণতা তৈরি হয়।
ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চেয়ে শাসকের ক্ষমতার স্থায়িত্বকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যখন একটি স্বৈরাচারী সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট ছাড়া কেবল বাহ্যিক শক্তির সমর্থনের ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের সার্বভৌম দরকষাকষির ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল, তা কোনোভাবেই এ দেশের সাধারণ মানুষের সামর্থ্য বা আত্মমর্যাদার প্রকৃত প্রতিফলন ছিল না; বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার আন্তর্জাতিক তোষণ নীতি।
ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রথম ও প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও তার কৌশলগত গুরুত্ব। বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর জন্য কোনো সাধারণ সহযোগী নয়; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি অপরিহার্য অনুঘটক।
বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান অক্ষ চীনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে যে বিশেষ কূটনৈতিক সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি কেবল কোনো দ্বিপাক্ষিক সৌজন্যের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম অবস্থান এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের যোগ্যতার এক অনন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের বহু প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক যেখানে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (আইপিএস) এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর সংযোগস্থলে অবস্থান করায়, কোন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে কত বেশি ফলপ্রসূ কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে—তা নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এক সুস্থ কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটি কোনো জাদুকরী বা আকস্মিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি হলো অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের শক্তির সঠিক মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিপক্ব ও দূরদর্শী পদক্ষেপের ফসল।
উদীয়মান নেতৃত্ব ও জনগণের যৌথ জাগরণে অন্ধকার অধ্যায় কাটিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পেরেছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে দুটি মূল উপাদানের মেলবন্ধন ঘটেছে—প্রথমত, দূরদর্শী নেতৃত্বের ক্যারিশমা এবং দ্বিতীয়ত, সর্বস্তরের জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ।
ফ্যাসিবাদের পতন-পরবর্তী এই সময়ে নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের তুষ্টির ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ধারিত হবে এ দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
একটি দেশের শাসনব্যবস্থা যখন জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গঠিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার নৈতিক শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের মূল ভিত্তি এখানেই। যেখানে রাষ্ট্র কোনো পরাশক্তির ‘করদ রাজ্য’ বা একক প্রভাব বলয়ের অধীনস্থ ভূখণ্ড নয়; বরং নিজস্ব শর্তে সমঅধিকারের ভিত্তিতে বন্ধুত্ব বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে। নেতৃত্বের এই দৃঢ়তার কারণেই বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক বাজার এবং ভূ-কৌশলগত অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে এখন এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বশক্তিগুলো এখন আর বাংলাদেশকে অবজ্ঞা বা একপেশে চাপ প্রয়োগের সাহস পায় না।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশ তার এই নতুন কূটনৈতিক সমীকরণকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের কেন্দ্রে অবস্থান করেও বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়েনি। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার যেখানে একমুখী ও ভারসাম্যহীন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল, সেখানে বর্তমান নেতৃত্ব এক নতুন ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে।
‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই ঐতিহাসিক নীতিকে একবিংশ শতাব্দীর জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক মঞ্চে কোনো করুণা বা দাক্ষিণ্যের পাত্র নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক উদীয়মান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতামত এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই উত্থান সুদূরপ্রসারী এবং স্থায়ী। অতীত দুর্দিনের গ্লানি, ফ্যাসিবাদের পরনির্ভরশীলতার নীতি এবং সুশাসনের অভাব মুছে ফেলে বাংলাদেশ আজ যে অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছে, তা অক্ষুণ্ন রাখার প্রধান হাতিয়ার হলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐক্য এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী শাসনব্যবস্থা। অভ্যন্তরীণভাবে গণতন্ত্র যত বেশি শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর তত বেশি দৃঢ় হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শীর্ষ বোদ্ধারাও আজ স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক কৌশল সফল হওয়া সম্ভব নয়। দূরদর্শী নেতৃত্বের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং জনগণের এই যৌথ জাগরণই আগামী দিনে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক অপরাজেয়, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখবে—এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
লেখক: প্রফেসর বদরুল ইসলাম, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, ঢাকা


