খসড়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ মন্ত্রিপরিষদে নীতিগত অনুমোদন পেলেও অংশীজন ও ভুক্তভোগীদের মৌলিক পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশসমূহ উপেক্ষা করা হয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বুধবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি প্রশ্ন তুলেছে, অতীতের পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম গুম, খুন ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের করুণ অভিজ্ঞতা থেকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বাস্তবে কী শিক্ষা গ্রহণ করল।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত খসড়া আইন দুটিতে কিছু ইতিবাচক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো বহাল রাখা হয়েছে।
একইসঙ্গে গুম প্রতিরোধ আইনেও কর্তৃত্ববাদী আমলে এ অপরাধে অভিযুক্ত সংস্থাগুলোর দায়মুক্তি সহায়ক ধারাসমূহ বজায় রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক বলেও মনে করে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক উল্লেখ করেন, অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও ২০০৯ সালের আইনের বিতর্কিত ১৮-ধারা বহাল রেখে কমিশনকে সরকার বা বাহিনী প্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কখনোই ‘এ’ ক্যাটাগরির স্ট্যাটাস অর্জন করতে পারবে না। এ ছাড়া স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় এমপি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নিয়ে গঠিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে কমিশনে সরকারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কমিশনের গঠনে বৈষম্যের কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে জানানো হয়, পাঁচজন সদস্যের মধ্যে মাত্র একজন নারী সদস্য রাখা হলেও বাছাই কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। একইভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের আইনগত বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন, জনবল নিয়োগে সরকারের পূর্বানুমোদন এবং ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রেষণে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের বিধান কমিশনকে কার্যত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।
টিআইবি আরও জানায়, ইতিপূর্বে খসড়ায় থাকা ইতিবাচক ১৪-ধারা (‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ’ অজুহাত হিসেবে অগ্রহণযোগ্য) এবং পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ‘সামরিক আটক কেন্দ্র’ পরিদর্শনের এখতিয়ার অনুমোদিত খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা গোপন আটক কেন্দ্র বা ‘আয়নাঘর’ বহাল রাখার সমর্থনের সামিল কি না—সেই প্রশ্ন তোলে।
গুম প্রতিরোধ আইনের বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্পর্শকাতর এ অপরাধের তদন্তের একক দায়িত্ব পুলিশের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে, অথচ বেশিরভাগ গুমের অভিযোগে শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম রয়েছে। উপরন্তু, অধস্তনের তদন্তে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্তোষজনক প্রমাণ না পেলে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা বিচারহীনতা নিশ্চিত করতে পারে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সনদের মানদণ্ড উপেক্ষা করে জনপ্রতিনিধি বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা গুমের সংজ্ঞায় রাখা হয়নি।
টিআইবি দাবি জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রসংস্কারের লক্ষ্য এবং ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংসদীয় অনুমোদনের আগেই ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে আইন দুটি পুনর্গঠন করতে হবে।


