এগার মাসে নতুন বন্দোবস্তের নামে দেশে ‘মবোক্রেসি’ তৈরি করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছেন, ‘সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে অভ্যুত্থানকে বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করে, এরপর বিপ্লবের নামে মব সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, এর দায় সরকারকে নিতে হবে।’
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদ আয়োজিত ‘ছাত্র শ্রমিক জনতার গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এগার মাসে যে নতুন বন্দোবস্ত তৈরি হয়েছে, তার নাম মবোক্রেসি। টাকার বিনিময় লোক ভাড়া করে মব তৈরি করা হয় এখন। প্রধানমন্ত্রী ১০ বছর না ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে? সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কী হবে? এসব মানুষের চিন্তার বিষয় না। মানুষ চায় নিরাপত্তা।’
একজন উপদেষ্টাকে উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অস্ত্রের ম্যাগাজিন নিয়ে বিমানবন্দরে যান, আবার মিসাইল নিয়ে ঘুরলেও দেশে কেউ নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করেন-এক বছরে এটাই আপনাদের অর্জন। দেশকে অনেক পিছিয়ে নিয়ে গেছেন আপনারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকারে রাজনৈতিক ব্যক্তি নেই, এমনকি অনেকে দেশেও থাকতেন না দীর্ঘদিন, তাই তারা জনগণের পালস বোঝে না। এ কারণে অধিকাংশ মানুষ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার চাইলেও, এই সরকার শিক্ষা বিষয়ে কোনো কমিশনই করেনি।’
সংস্কারের নামে অন্তবর্তী সরকার সময়ক্ষেপণ করছে বলেও অভিযোগ রুমিন ফারহানার। তিনি বলেন, ‘ন্যূনতম যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যায়, তাই যথেষ্ট। বাকিটা আগামীতে নির্বাচিত সরকার এসে ঠিক করবে। জনগণকেই ঠিক করতে দিন তারা কী চায়। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষই যথেষ্ট।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে অভ্যুত্থানকে বিপ্লব নাম দিয়ে এবং বিপ্লবের নামে মব সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার প্রধান দায় সরকারকেই নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর দেশকে অনেকে গণিমতের মাল মনে করছেন, এই ভাগবাটোয়ারা না থামালে চূড়ান্ত বিজয় আসার আগেই ব্যর্থ হতে হবে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ না করলে আম-ছালা দুটোই যাবে। তাই পুরোনো ফ্যাসিবাদ নতুনরূপে ফিরে আসার রাস্তা বন্ধ করুন।’
অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘রক্ত ঝরা বা মানুষ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আপনাদের টনক নড়ে না। আপনারা কীসের সরকার?’
এ সময় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, ‘ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যা ব্যক্তির ঊর্ধ্বে থাকবে, ব্যক্তির ক্ষমতাকে বাড়তে দেবে না। নির্বাহী বিভাগ দেশ চালাবে কিন্তু তাদের ওপর নজরদারি করবেন জনপ্রতিনিধিরা। তারা জনগণের সম্মতি নেবেন কিন্তু কোনোকিছু চাপিয়ে দেবেন না।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘৫৩ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হবে। নেতাদের ওপর দেবত্ব আরোপ বন্ধ করতে হবে। দলের ভেতরে জবাবদিহিতা চালু করতে পারলে ব্যক্তির স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, মার্কসবাদী বাসদের সমন্বয়কারী মাসুদ রানা, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতাহারী, সোনার বাংলা পার্টির চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ প্রমুখ।
সভায় সভাপতির করেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদের আহ্বায়ক শেখ আবদুন নূর এবং সঞ্চালনা করেছেন সংগঠটির সদস্য সচিব বাবর চৌধুরী।


