‘ত্রাণ নয়, মাথা গোঁজার নিরাপদ ঘর চাই’

‘ত্রাণ নয়, মাথা গোঁজার নিরাপদ ঘর চাই’
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বসতঘর হারিয়ে ভাইয়ের ঘরে আশ্রয় নেওয়া দিনমজুর ইয়াকুবের ভাঙা বাড়ির দৃশ্য। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বন্যার পানি নেমে গেছে অনেক আগে। কিন্তু নিজের ঘরে আর ফেরা হয়নি দিনমজুর ইয়াকুবের। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে এখন তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ভাইয়ের ঘরে। ভেঙে যাওয়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে তার একটাই আবেদন, ত্রাণ নয়, মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঘর।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কাথারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইয়াকুব বলেন, ‘আমার ঘর ভেঙে গেছে, এখন অন্যের ঘরে থাকি। এখন কোথায় যাব, তা জানি না।’

তিনি বলেন, ‘সবাই এসে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। কেউ ৫০০, কেউ ১ হাজার টাকা সাহায্য করছে, যার যত সামর্থ্য। কিন্তু এগুলো দিয়ে তো নতুন ঘর হবে না। দিনমজুরি করে আমার পক্ষে আবার ঘর তোলা সম্ভব না। বন্যার সময় বুকসমান পানি উঠেছিল। এখন সরকারের কাছে একটা দাবি, আমার ঘরটা যেন করে দেয়। ত্রাণ নয়, মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঘর চাই।’

গত ৮ জুলাই থেকে টানা রেকর্ড বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ প্রায় ১০ দিন পানিবন্দী ছিলেন। পানি নেমে যাওয়ার পর অনেকের সামনে নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেঙে পড়া বসতঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের পেকুয়াসহ বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় এখন অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেউ কেউ ভাঙা ঘর মেরামতের চেষ্টা করছেন। তবে যাদের আয় দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল, তাদের কাছে নতুন করে ঘর নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬ হাজার ৮২৭টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ হাজার ২২৮টি ঘর। এসবের মধ্যে ১৩ হাজার ৪৫৯টি ছিল মাটির ঘর, যেগুলোর অনেকগুলো প্রবল স্রোত ও পানির চাপে আংশিক বা পুরোপুরি ধসে পড়েছে।

আরও পড়ুন

বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও মাটির দেয়াল ভেঙে পড়েছে, কোথাও টিনের চালা উড়ে গেছে। আবার অনেক ঘরের মেঝে ধসে যাওয়ায় সেগুলো আর বসবাসের উপযোগী নেই। অনেক পরিবার সামান্য সঞ্চয় কিংবা ধারদেনা করে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছে।

বন্যায় শুধু বসতঘর নয়, মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের, গবাদিপশু ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষতির কারণে অনেক পরিবার আয়হীন হয়ে পড়েছে। ফলে মাথার ওপর একটি ছাদ ফিরিয়ে আনাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও এগিয়ে এসেছে। তিনি জানান, ১ হাজার ৫০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০০ পরিবারের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও সহায়তা দেওয়া হবে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আর্থিক চাপ কমাতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দুর্যোগকালীন বিশেষ ঋণ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ ত্রাণ বিতরণ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। বিশেষ করে যাদের বসতঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে, তাদের দ্রুত ঘর নির্মাণে সহায়তা না করলে অনেক পরিবারকে দীর্ঘদিন অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হবে।

ইয়াকুবের মতো অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশাও তাই একটাই–একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে পরিবার নিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা যাবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad