চোখের চিকিৎসা শেষে শনিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের। রোববার বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি ফিরলেন অ্যাম্বুলেন্সে, নিথর দেহে।
রনজিলা পারভীন বগুড়ার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। চোখের চিকিৎসার জন্য শুক্রবার রাতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় যান। শনিবার সকালে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান তিনি।
সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকায় পৌঁছে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে রিকশায় করে ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাচ্ছিলেন রনজিলা। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে একটি মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা রিকশার পাশ থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয়।
এতে রনজিলা রিকশা থেকে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিলার বাড়ি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায়। স্বামী আব্দুল মতিন ও নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে রাইসা আক্তারকে নিয়ে সেখানে থাকতেন তিনি।
ওই দিন রাতে তার মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়। রোববার বাদ যোহর বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাদ আসর গাবতলীর তরফসরতাজ গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রনজিলার মেয়ে রাইসা আক্তার বলেন, ‘আমার মতো আর যেন কাউকে এভাবে মা হারাতে না হয়। আমি মায়ের হত্যার বিচার চাই।’
স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন।
রনজিলার সহকর্মী সহকারী শিক্ষক মেহেনাজ আফরীন ও মাছুমা খাতুন বলেন, রনজিলা সবার আগে বিদ্যালয়ে আসতেন। প্রধান শিক্ষক হয়েও নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতেন এবং শিক্ষকদের নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। তার চলে যাওয়ায় তারা একজন অভিভাবক হারিয়েছেন বলে জানান।
আরেক সহকর্মী রিজবোনা আক্তার বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে ছয়জন শিক্ষক মিলে বিদ্যালয়ে মিলাদ মাহফিলে অংশ নিয়েছিলেন। পরে রনজিলার অনুরোধে সবাই মিলে তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তোলেন।
রিজবোনা আক্তার বলেন, সেদিন রনজিলা জানিয়েছিলেন, শুক্রবার রাতে চোখের ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবেন। এরপর সবাই বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যে যার বাড়িতে ফিরে যান। পরে আর তার সঙ্গে কথা হয়নি।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ছুটির দরখাস্ত দিয়ে রনজিলা ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, রনজিলার পায়ে চোট লেগেছিল এবং সেখান থেকে চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এ কারণে তিনি ঢাকায় চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন।
কামরুল হাসান আরও বলেন, প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে তারা শোকাহত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রনজিলা পারভীন ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন রনজিলা পারভীন, রোববার সেই বিদ্যালয়েই নেওয়া হয় তার মরদেহ। চোখের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়ে তাকে ফিরতে হলো নিথর দেহে।


