কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও প্রকল্পটির কারণে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি, উপকূলীয় উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় জলবায়ু-সহনশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ শুধু পরিবেশগত সম্পদ নয়; এগুলো ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রের ঢেউ ও উপকূলীয় ক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করে। গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের আগে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। চলমান প্রকল্পে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে—উন্নয়নের নামে এমন কোনো প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থ ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার সহায়ক হতে পারে না।
জাইকার নিজস্ব ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল কনসিডারেশনস’ গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি এড়িয়ে চলা বা কমিয়ে আনা, বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো জাইকার গাইডলাইনে গুরুত্ব পেয়েছে।
সুগন্ধা-কলাতলী বালিয়াড়ির মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব সুরক্ষাব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা জাইকা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবি বলেছে, বিষয়টি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও জাপানের জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বিষয়টিও জড়িত। দুই দেশই কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটির (সিবিডি) রাষ্ট্রপক্ষ এবং কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্কে (কেএমজিবিএফ) অঙ্গীকারবদ্ধ বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাপানের ন্যাশনাল বায়োডাইভার্সিটি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যানে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘নেচার পজিটিভ’ অর্থনীতিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাকে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানায় টিআইবি।
জাইকা ও জাপান সরকারের প্রতি প্রকল্পটির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে জনসমক্ষে সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও কারিগরি পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ইতোমধ্যে কোনো পরিবেশগত ক্ষতি হয়ে থাকলে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও স্থানীয় উপকূলীয় উদ্ভিদ পুনরুদ্ধারসহ একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পুরো প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।


