সরকারের সাথে জামায়াতের সম্পর্কে চিড় ধরেছে

সরকারের সাথে জামায়াতের সম্পর্কে চিড় ধরেছে
Advertisement
Advertisement

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, প্রশাসনে বড় রদবদল এবং এলাকার উন্নয়ন তহবিল নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগে বিএনপি সরকার ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরেছে। দুই দলের ভেতরের নেতারা জানাচ্ছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দলের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার যে আশা দেখা দিয়েছিল, তা এখন দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে তৈরি হচ্ছে ক্ষমতাসীন ও প্রধান বিরোধী দলের দূরত্ব।

যদিও জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধের শুরু, তবে পর্দার আড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিয়ে আসল লড়াই চলছে। জামায়াত মনে করছে, তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরের জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড থেকে জামায়াতপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া এবং প্রশাসন ও শিক্ষা খাত থেকে জামায়াত-সমর্থিত কর্মকর্তাদের দলে দলে নিয়োগ বাতিল করা তারই প্রমাণ।

জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে তাদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে। তাদের দাবি, জামায়াতের জেতা এলাকায় উন্নয়ন কাজ চালাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নারী সংসদ সদস্যরা। এছাড়া সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বিশেষ বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলগুলোকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটিতেও সরকারি দল একচেটিয়া প্রভাব খাটানোর কারণে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজেদের এলাকায় পছন্দের লোক রাখতে পারছেন না।

জামায়াত নেতাদের মতে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপি এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যাতে জামায়াতের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই দীর্ঘদিনের পুরোনো বন্ধুত্বে ফাটল ধরছে।

অন্যদিকে, বিএনপির বক্তব্য হলো সরকার চলবে তার নিজস্ব নীতিতে, তাই বিরোধী দলের সব আবদার পূরণ করা সম্ভব নয়। তারা জামায়াতের দাবিগুলোকে একটু বেশি বলেই মনে করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, তা স্পষ্ট। বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি এখন জুলাই সনদসহ সবকিছু নিজের মতো করে চালাতে চায়। আর জামায়াত চাপ দিয়ে নিজের দাবি আদায় করতে চাইছে। এই দ্বন্দ্ব হয়তো স্থায়ী হবে না, তবে এটা চলতে থাকলে রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে।’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যত ঝামেলা

জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি সরকারের মধ্যে বিরোধের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবি ও চেতনা বাস্তবায়নে সরকার তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। রাজনৈতিক সংস্কার, বিচার বিভাগ ঢেলে সাজানো এবং প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে সরকার ইচ্ছা করেই দেরি করছে।

তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা জুলাই সনদের প্রতি অনুগত এবং প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে পূরণ করা হবে। জামায়াত যেভাবে তাড়াহুড়ো করছে এবং চাপ দিচ্ছে, তা ক্ষমতাসীন বিএনপি ভালোভাবে নিচ্ছে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার বানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বিএনপি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু কিছু পক্ষ বিষয়টিকে বাড়িয়ে তুলছে। বিএনপি এটি পছন্দ করছে না।’

আরও পড়ুন

এই অসন্তোষের কারণেই গত মঙ্গলবার জামায়াতপন্থী ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল একযোগে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রে তারা স্পষ্ট লিখেছেন—জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতি, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় বাতিল এবং বিচারক নিয়োগের স্বাধীন অধ্যাদেশ বাতিল করার কারণেই তারা পদ ছাড়লেন।

উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে জামায়াত জোট বৃহস্পতিবার জুলাই-আগস্টের আন্দোলন স্মরণে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। জোটের সূত্রগুলো বলছে, চলতি বাজেট অধিবেশন শেষ হলেই এই কর্মসূচি আরও জোরদার হবে, যাতে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনেই সরকার দাবিগুলো মানতে বাধ্য হয়।

প্রশাসন ও উন্নয়নে বৈষম্যের অভিযোগ

জামায়াতের মূল ক্ষোভ এলাকার উন্নয়ন বাজেট এবং প্রশাসনের পক্ষপাত নিয়ে। জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, তাদের জেতা এলাকায় স্থানীয় কাজ তদারকি করার জন্য সরকারি দলের নারী সংসদ সদস্যদের পাঠানো হচ্ছে। জামায়াত মনে করে, এটি তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা খর্ব করার এবং তৃণমূল পর্যায়ে তাদের জনপ্রিয়তা কমানোর একটি চাল।

তাছাড়া, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যখন বিশেষ তহবিল, নতুন প্রকল্প ও প্রশাসনের পুরো সমর্থন পাচ্ছেন, তখন বিরোধী সংসদ সদস্যদের পুরোপুরি কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন টাইমস’কে বলেন, সরকার সরাসরি জামায়াতকে দমনের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে এমন একটা ভাব আছে যে জামায়াতকে কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। সব ক্ষেত্রে আমাদের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।’

ইসলামী ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে টানাটানি

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট দুই দলের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ। জামায়াতের অভিযোগ, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে জামায়াতপন্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের বেছে বেছে বের করে দেওয়ার জন্য সরকার কাজ করছে। শুধু ব্যাংক নয়, জামায়াতের সাথে জড়িত আরও কিছু আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেও সরকার টার্গেট করছে বলে তারা মনে করে।

জামায়াত নেতারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স যেভাবে তড়িঘড়ি বাতিল করা হলো, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তদন্ত বা ভুল সংশোধনের কোনো সময় না দিয়ে লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে মূলত জামায়াতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে দেওয়ার জন্য।

সাইফুল আলম খান মিলনের মতে, ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াত সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকার এখন “বিশেষ নজর” রাখছে।

সরকার মনে করে ‘অযৌক্তিক’ দাবি

স্বভাবতই, সরকারের মন্ত্রীদের কথা একদম ভিন্ন। ক্ষমতাসীন বিএনপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো দলের চাপের মুখে মাথা নত করবে না। তাদের মতে, বিরোধী দলের দাবি ও অভিযোগ অযৌক্তিক।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম টাইমস’কে বলেন, প্রশাসন, ব্যাংক বা উন্নয়ন খাতের কোনো সিদ্ধান্তই কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের চাপে বা ইচ্ছায় নেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘একসাথে আন্দোলন করা আর রাষ্ট্র চালানো এক জিনিস নয়। আন্দোলনের মাঠে পাশে থাকার মানে এই নয় যে দেশ চালানোর নিয়ম বদলে যাবে। ক্ষমতায় আসার পর সরকারকে দেশের স্বার্থ ও নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হয়। তাই বিরোধী দলের সব আশা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর