মরক্কোর উড়ন্ত ফর্মের সামনে প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে ব্রাজিলের হেক্সা-মিশনের গাড়িটা যেন একটু খকখক করছিল। ঠিক তখনই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনল সাম্বা জাদুকরদের।
আসলে সাম্বা নাচের সাথে ড্রাম-বিউগল যতটা যায়, ব্যাগপাইপের সুর ততটা যায় না। সেটাই দেখলো ব্যাগপাইপের চারণভূমি স্কটল্যান্ড।
প্রথম ম্যাচের পর সেলেসাও ভক্তরা যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, তারা হাতেনাতে তা পেয়ে গেলেন: মাঠ কাঁপিয়ে ফিরে এসেছে হলুদ ঝড়! আর তাতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ ব্রাজিল সমর্থক, যারা জার্সিতে ‘ষষ্ঠ তারকা’ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন।
আরে ভাই, ফুটবলে কোনো কিছুই অসম্ভব না! মনে নেই, ২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও কিন্তু নিজেদের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে আছাড় খেয়েছিল? প্রথম রাউন্ডে কী হলো না হলো, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আসল খেলা তো শুরু হয় নক-আউট পর্বে গিয়ে। অতীতের বিশ্বকাপগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সব বড় বড় দলই এই মরণ-বাঁচন পর্বে এসে একদম কোমর বেঁধে, মোজা টেনে মাঠে নামে।
ব্রাজিল অবশ্য অনেকটা অনায়াসেই দ্বিতীয় পর্বে পা গলিয়ে দিয়েছে। তবে স্কটিশরা যদি মাঠে একের পর এক ঐতিহাসিক সব ‘ব্লান্ডার’ বা মারাত্মক ভুল না করত, তাহলে কিন্তু ম্যাচটা বেশ রোমাঞ্চকর হতে পারত। ফুটবল ব্যাকরণের প্রথম পাঠটাই তারা ভুলে বসেছিল: ডি-বক্ষের ঠিক বাইরে ভুলেও বল নিয়ে বেশি সময় ‘পিরিত’ করা যাবে না, বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন ব্রাজিল!
প্রথম গোলটার পেছনে ছিল স্কটিশ ডিফেন্ডারের এক চরম অলসতা। বল ক্লিয়ার করতে তিনি এত সময় নিলেন যে, টেরই পাননি পেছনে ওত পেতে থাকা ব্রাজিলের ক্ষুধার্ত শিকারী ভিনি জুনিয়র কখন এসে বলটা কেড়ে নিলেন। মানুষ মাত্রই ভুল করে, ফুটবলাররাও মানুষ—তা মেনে নিলাম। কিন্তু এই গোল হজমের আফসোস স্কটিশ সমর্থকদের বহুদিন তাড়িয়ে বেড়াবে। বড় ম্যাচে এমন শিশুতোষ ভুল আসলে আরও বড় ট্র্যাজেডিকেই আমন্ত্রণ জানায়।
এবং ঠিক তা-ই হলো! দ্বিতীয়বারও একই ভূত ভর করল স্কটিশদের ঘাড়ে—সেই বল ধরে রাখার রোগ, তাও এক সেকেন্ড বেশি! স্কটল্যান্ডের কপাল ভালো যে, রেফারি সে যাত্রা গোলটা বাতিল করে দেন। কিন্তু ভাগ্য তো আর বারবার সহায় হয় না। দ্বিতীয় গোলটা যখন এল, তখন সেকেন্ড পোস্টে একদম ঢিলেঢালা পাহারায় অনেকটা ফাঁকা ছিলেন ভিনি জুনিয়র। ভিনিও যেন বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ!” ঠাণ্ডা মাথায় আলতো হেডে জালে জড়িয়ে দিলেন বল। মুহূর্তেই গ্যালারিতে এক হলুদ সমুদ্র আছড়ে পড়ল, আর এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল স্কটিশদের ঐতিহ্যবাহী ব্যাগপাইপের সুর।
তৃতীয় গোলের কেচ্ছায় যাওয়ার আগে একটা কথা বলতেই হয়—পুরো ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে একবারের জন্যও স্বস্তিতে দেখায়নি। মাঠে তাদের কোনো ধার ছিল না। অবশ্য ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে অতীত ইতিহাসও তাদের পক্ষে কথা বলছিল না। বিশ্বকাপে এর আগে চারবার দেখা হয়েছিল দুই দলের। কেবল ১৯৭৪ সালে স্কটিশরা ব্রাজিলকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিতে পেরেছিল। বাকি সব ম্যাচে জুটেছে কেবল হার—১৯৮২ সালে ৪-১, ১৯৯০ সালে ১-০ আর ১৯৯৮ সালে ২-১।
এবারের ৩-০ গোলের হার ১৯৮২ সালের পর স্কটল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয়। ১৯৮২ সালের সেই ব্রাজিল দলটিকে ফুটবলপ্রেমীরা ‘ড্রিম টিম’ বা স্বপ্নের দল বলে ডাকেন। যে দলে ছিলেন সক্রেটিস, অস্কার, জিকো আর ফ্যালকাওয়ের মতো ফুটবলের আসল জাদুকররা।
এখানে একটু আমাদের নিজেদের ইতিহাস টেনে আনা যাক। আশির দশকে ‘সাদা পেলে’ জিকোর জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, ওই সময়ে জন্ম নেওয়া অনেক বাচ্চার ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘জিকো’। আজও আমাদের পাড়া-মহল্লায় খুঁজলে এক-আধজন জিকো ভাই ঠিকই মিলে যাবে। দুঃখের বিষয়, ব্রাজিলের সেই স্বর্গীয় সুন্দর ফুটবল খেলা দলটি কোটি মানুষের মন জয় করলেও ট্রফি ঘরে তুলতে পারেনি।
যাহোক, গ্যালারিতে স্কটল্যান্ডের ‘টার্টান আর্মি’ সমর্থকরা নিজেদের চিল চিৎকার আর প্রাণবন্ত হুল্লোড়ের জন্য বেশ বিখ্যাত। কিন্তু এদিন ব্রাজিলের বিপক্ষে নিজেদের দলের এমন বোকা বোকা ভুল দেখে তাদের চনমনে মেজাজ একদম পাংসুটে হয়ে গেল।
ব্রাজিলের তৃতীয় গোলটার কথা বললে বলতে হয়—এ যেন এক নিখুঁত আর্ট ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিদর্শন! স্বার্থপরের মতো নিজে শট না নিয়ে, একদম শান্ত মাথায় বলটি বাড়িয়ে দেওয়া হলো কুনহার দিকে, আর আলতো টোকায় বলটি ঠিকানায় পৌঁছে দিলেন কুনহা।
মোদ্দা কথা: দিন যত যাচ্ছে, সাম্বার ড্রামবিট তত জোরালো আর জমাট হচ্ছে। স্কটল্যান্ডের কপালটাই মন্দ। তবে তারা এখন ঘরের বিমান ধরবে সেই ছোট ছোট ভুলের জন্য বুক চাপড়ে আক্ষেপ করতে করতে, যা আরও একবার প্রথম রাউন্ডেই তাদের পোঁটলা-পুটলি গুটিয়ে বিদায় করে দিল।
তাতে কী! মন খারাপ করে তো লাভ নেই, এবার স্কচ হুইস্কি ল্যাফ্রোইগের বোতলের ছিপি খোলা যাক আর মনে আশা জাগিয়ে আমরা ২০৩০ বিশ্বকাপের দিকে চোখ রাখি!


