শ্রমিকদের বেতন বাড়লেই বাড়ি ভাড়ায় লাফ

শ্রমিকদের বেতন বাড়লেই বাড়ি ভাড়ায় লাফ
ছবি: জাকির হোসেন/টাইমস
Advertisement
Advertisement
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে সেই সুফল অনেকটাই কমে যায়। এবার নতুন মজুরি কার্যকরের আগেই বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পাওয়ায় উদ্বেগে পড়েছেন শ্রমিকরা।

স্পেরো গার্মেন্টসের অপারেটর রানী জানান, নতুন বছর থেকে তার মেসের প্রতি কক্ষের ভাড়া এক হাজার টাকা বাড়ানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিলসহ বাড়তি খরচের কারণ দেখিয়ে মেসমালিক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অতীতে দেখা গেছে, যতবার বেতন বেড়েছে, ততবারই বাড়িভাড়া বেড়েছে। এবারও ভাড়া বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এরই মধ্যে ডিসেম্বর থেকে নতুন হারে বেতন কার্যকরের ঘোষণা এসেছে। তবে বেতন কত হবে, সে বিষয়ে এখনো নিম্নতম মজুরি বোর্ডে কোনো আলোচনা হয়নি। নতুন বছরের প্রথম বেতন নতুন হারে দেওয়া হবে বলে নিশ্চয়তা মিলেছে।

আন্দোলনে থাকা শ্রমিকরা বারবার নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কথা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন তারা। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টিও তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

গাজীপুরের টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বোর্ডবাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, চন্দ্রা, সফিপুর ও মৌচাকসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক বসবাস করেন। তাঁদের বেশিরভাগই কারখানার আশপাশে মেস, একক কক্ষ বা ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। ফলে বাড়িভাড়া সামান্য বাড়লেও তাঁদের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

খরচ কমাতে একই কক্ষে একাধিক শ্রমিক থাকেন। অনেকে আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট বাসায় বসবাস করেন। বাড়িভাড়া বাড়লে কেউ কক্ষ পরিবর্তন করেন, কেউ মেসে ওঠেন, আবার কেউ পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে বাধ্য হন। এতে তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে।

কলম্বিয়া গার্মেন্টসের মোহাম্মদ নাদিম আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘মজুরি বাড়ানোর আলোচনা শুরু হলেই বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগেই বাড়িভাড়া বাড়লে সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধির সুফলও অনেকটা বাড়িওয়ালাদের পকেটে চলে যাবে।’

মেট্রিক সোয়েটারসের সুইং অপারেটর সুমি জানান, মাস শেষে পাওয়া বেতন দিয়ে বাসাভাড়া, খাবার, পরিবারের খরচ ও যাতায়াত ব্যয় মেটাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে বাড়িভাড়া বাড়লে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

শুধু পোশাকশ্রমিক নন, গাজীপুরে বসবাসরত বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কায় রয়েছেন। অনেকের বেতন দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত থাকলেও বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

স্টাইল অ্যাপারেলসের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার মো. সুমন জানান, বাড়িভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। অনেক সময় বাড়িওয়ালারা হঠাৎ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। বাড়তি ভাড়া দিতে না চাইলে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেককে বাড়তি ভাড়া মেনে নিতে হয়।

ইন্ট্রামেক্স গার্মেন্টসের একজন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকেন। গত দুই বছরে তার বাসাভাড়া ১৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে।

নতুন বাসা খোঁজা, অগ্রিম ভাড়া দেওয়া ও মালামাল পরিবহনের খরচ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই বয়সে নতুন বাসা খোঁজা, অগ্রিম ভাড়া দেওয়া, ট্রাকভাড়া, এত টাকা পাব কোথায়? মনে হয় শহরটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য নয়।’

বাড়ির মালিকদের যুক্তি, তাদেরও খরচ বেড়েছে। লক্ষ্মীপুরা এলাকার বাড়িওয়ালা মো. আবু বক্কর সিদ্দীক টাইমসকে বলেন, বিদ্যুৎ বিল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। তাদেরও সংসার চালাতে হয় এবং বাড়িভাড়ার আয় দিয়েই সংসার চলে।

তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়তে পারবে, শুধু বাড়িভাড়া বাড়লেই দোষ হবে, এটা কেমন কথা?’

পশ্চিম জয়দেবপুর এলাকার বাড়িওয়ালা জায়েদুল হামিদ টাইমসকে বলেন, সরকার পে-স্কেল বাড়ালে বাজারে মানুষের হাতে টাকা এসেছে বলে ধারণা তৈরি হয়। তখন দোকানদাররা পণ্যের দাম বাড়ান। বাড়িওয়ালারাও ভাড়া বাড়াতে চান।

গাজীপুরে বাসার চাহিদা বেশি থাকায় ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যার পোষাবে থাকবে, না পোষালে চলে যাবে।’

ম্যাট্রিক্স সোয়েটারের নিটিং অপারেটর একলাছউদ্দিন চান, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে যেন বাড়িভাড়া না বাড়ানো হয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপও দাবি করেন তিনি।

প্যানাশিয়া সোয়েটারের অ্যাডমিন ম্যানেজার চঞ্চল কুমার বলেন, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িভাড়া বাড়লে শ্রমিকদের বাড়তি বেতনের সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। এবার যেন বাড়িভাড়া না বাড়ানো হয়, সে বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতির কাছে আবেদন জানান তিনি।

শ্রমিকদের বাড়িভাড়া নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া টাইমসকে বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই উচিত নয়। কারণ, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।’

বিষয়টিকে নিয়মের মধ্যে আনতে প্রয়োজনে আইনি কাঠামোর আওতায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad