রাখের উপবাস: আলোর শিখায় বিশ্বাস ও ভক্তির নিবেদন

রাখের উপবাস: আলোর শিখায় বিশ্বাস ও ভক্তির নিবেদন
ছবি: কাজী আরিফুজ্জামান রোজেল/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

বিকালের আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদীতে শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে জড়ো হতে থাকেন অসংখ্য ভক্ত। তাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আশ্রম প্রাঙ্গণে নারী-পুরুষেরা সারিবদ্ধভাবে বসে সাজিয়ে নেন মাটির প্রদীপ, ফুল, ধূপকাঠি ও পূজার উপকরণ। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন পূজার নানা সামগ্রী আর প্রিয়জনদের মঙ্গল কামনায় বুকভরা প্রার্থনা এবং ইশ্বরের কৃপা পাওয়ার বিপুল প্রত্যাশা।

এই ধর্মীয় স্বতন্ত্র আচার ‘রাখের উপবাস’ নামে পরিচিত। এটি কার্তিক ব্রত, গোসাঁইয়ের উপবাস ও ঘৃত প্রদীপ প্রজ্বলন নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আয়োজন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমে এর গুরুত্ব ও আবেদন অনেক বেশি।

বাংলা কার্তিক মাসের শেষ পক্ষের মঙ্গলবার ও শনিবার এই ব্রত পালন করা হয়। দিনভর উপবাসের পর সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন ভক্তরা। উপবাস, ভক্তি আর ঘিয়ের প্রদীপ প্রজ্বালন—এই তিনের সমন্বয়েই পালিত হয় রাখের উপবাস।

ছবি: কাজী আরিফুজ্জামান রোজেল/ টাইমস

 

সারাদিন উপবাস থাকার পর সূর্যাস্তের সময় ভক্তরা আশ্রমে সমবেত হন। পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জনদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মঙ্গল কামনায় তারা প্রার্থনা করেন। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাধক বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর নাম। তার স্মৃতি ও আদর্শকে ঘিরেই আজও বারদী আশ্রমে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত।

আরও পড়ুন

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রোগব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় কার্তিক মাসে উপবাস পালন এবং আশ্রমে প্রদীপ ও ধূপ জ্বালানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বাবা লোকনাথ।

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আশ্রমজুড়ে শুরু হয় আলোর মেলা। সারি সারি মাটির প্রদীপে জ্বলে ওঠে ঘিয়ের শিখা। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো আশ্রম প্রাঙ্গণ। প্রার্থনায় মগ্ন ভক্তদের মুখে ফুটে ওঠে গভীর বিশ্বাস ও ভক্তির ছাপ।

ছবি: কাজী আরিফুজ্জামান রোজেল/ টাইমস

প্রতিটি প্রদীপ যেন একেকটি প্রার্থনার প্রতীক। কেউ পরিবারের সুস্থতা কামনা করেন, কেউ প্রিয়জনের নিরাপত্তা চান, আবার কেউ জীবনের নানা সংকট থেকে মুক্তির আশায় প্রদীপ জ্বালান। প্রতিটি শিখার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি মানুষের ব্যক্তিগত আশা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

নীরবতা ও গভীর ভক্তির মধ্য দিয়ে চলতে থাকে এই আয়োজন। প্রার্থনা শেষে ভক্তরা উপবাস ভঙ্গ করেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, এ সময় তাদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

রাখের উপবাস কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব মানুষকে একত্র করে বিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন ও সামষ্টিক ভক্তির বন্ধনে।

বারদী আশ্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার যখন শত শত প্রদীপের আলোয় দূর হয়ে যায়, তখন প্রতিটি শিখা যেন একটি বার্তাই বহন করে—প্রিয় মানুষগুলো ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, নিরাপদে থাকুক। আর সেই প্রত্যাশা থেকেই ভক্তরা জ্বালিয়ে যান একের পর এক প্রদীপ, নিবেদন করেন তাদের আন্তরিক প্রার্থনা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad